Wednesday, July 08, 2009

আবুল হাসান

এই বুড়ো বয়সে প্রায় বালকবেলার মতই উল্লসিত হয়ে উঠেছি, যখন কাগজের প্যাকেট খুলে দেখি, সেখানে চুপটি করে আমার জন্যে বহুকাল ধরে অপেক্ষা করছেন আবুল হাসান।
আমার শৈশব বা কৈশোর কেটেছে আবুলহাসানবিহীন, এবং আশ্চর্য হলো তাতে আমার কোন দুঃখও নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে মদের পেয়ালা মুখে তোলা মানা, এটা কে না জানে? এই দুপুর-রাতে তাই মাঝারি স্বাস্থ্যের বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অজান্তেই কেমন নেশাতুর হয়ে পড়ি।
মজার ব্যাপার হলো, আবুল হাসানের নাম প্রথম ভালভাবে শুনি মির্জাপুরের সাকেব ভাইয়ের কল্যাণে। তিনি তখন প্রবল বিক্রমে সামহোয়ারইনে ব্লগিং করেন, কিন্তু আসল নামে নয়। একটা অদ্ভুত নিকে- চামেলি হাতে নিম্নমানের মানুষ। এই লম্বা ও আজব নিকের খোঁজ নিতে গিয়ে প্রথম শুনলাম আবুল হাসানের নাম, তারপরে পড়া হলো তাঁর আশ্চর্য সব কবিতা।

সাকেব ভাইই প্রথম কোট করেছিলেন, ঝিনুক নীরবে সহো, সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও।
তারপরে কোত্থেকে কেমন করে খুঁজে পাই সেই বিখ্যাত কবিতা, আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ…। পড়ে টড়ে আমি বেমক্কা তব্দা খেয়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।

এবার তাই দেশ থেকে বই আনাবার সুযোগ পেতেই লিস্টির একদম শুরুতে রেখেছিলাম আবুল হাসানের কবিতা সমগ্রের নাম।
অবশেষে ঠিক যেন আকাশ থেকে টুপ করে আমার হাতে চলে এলো বইটা।

এটা একটা আশ্চর্য বোধ, যেন তেপান্তরের মাঠের মধ্যিখানে কেউ হঠাৎ করে আমার হাতে কোন অমূল্য রত্নভান্ডার ধরিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে, আমি পাতার পর পাতা মুগ্ধ চোখে পড়েই যাচ্ছি কেবল। সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে- এই কবিতার নামও- আবুল হাসান!

একটু বোধহয় মাতলামীতে পেয়েছে আমাকে আজ। আপাতত সদ্য পড়া একটা চমৎকার কবিতা শুনিয়ে বিদেয় হই।

নিঃসঙ্গতা

অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!

অতটা চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!

একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

Friday, July 03, 2009

সদ্য পড়া বইঃ শমন শেকল ডানা

হাসান ভাইয়ের বইটা হাতে আসতে বেশ লম্বা সময় লেগে গেলো।
বইমেলার পরপর একবার বই আনিয়েছিলাম কিছু, এবারে দেশ থেকে আরও কিছু বই আনালাম। বইগুলো হাতে পেয়ে দেখি একেবারে হাসান-হোসেনময় বই সব! আবুল হাসান আর আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতার কালেকশান, হাসান ভাইয়ের শমন শেকল ডানা আর আকমল হোসেন নিপুর জলদাসের মৎস্য ঘ্রাণ। শমন শেকল ডানাই পড়া শেষ হলো সবার আগে।

বইটার প্রচ্ছদেই বিষণ্ণ ছাপ রয়েছে একটা, মন খারাপ করিয়ে দেয়া একটা অনুভুতি, আশ্চর্য এই যে এই অনুভুতিটাই পুরো বইটুকু পড়ার সময় হাত ধরে হেঁটেছে আমার সাথে।

ফ্ল্যাপের ভূমিকাটুকু কে লিখেছে জানি না, কিন্তু খুব ভাল লিখেছেন। বই পড়তে শুরু করার আগেই বেশ ভাল রকম প্রস্তুত করিয়ে দেয় মনটাকে।
বইয়ের গল্পটা একেবারেই আমাদের চেনাজানা গল্প। গত কবছরে, বা তারও আগে থেকে এখন পর্যন্ত, বা আর কোন অজানা ভবিষ্যত পর্যন্ত হয়ত এই গল্পের ভেতরের ঘটনাগুলোকে ঘটতে দেখেছি এবং দেখতে থাকবো আমরা। বামপন্থী মিছিলের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি সামরিক বাহিনিতে যোগ দিয়ে কেমন করে বদলে যায়, অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা নাসিমা আপা মৌলবাদী স্বামীর কবলে পড়ে কেমন করে বোরকার অন্তরালে চলে যায়। পাহাড়ের মানুষদের উচ্ছেদের গল্পও আছে এখানে, ধর্মের ব্যবধানে সংখ্যায় কম যারা, অত্যাচারিত হয়ে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার দুঃখও আছে। একদম, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরগুলোই গল্প হয়ে এসেছে এ বইটিতে।
তবে এখানেই খানিকটা সমস্যা আছে। বইয়ের গল্পটি আমাদের জানা, এবং বইটি পড়ে শেষ করার পর আমি আর নতুন কোন অনুভবে আন্দোলিত হইনি। এই জায়গাটায় সম্ভবত হাসান ভাই কিছু করে দেখাতে পারতেন।
হাসান ভাইয়ের লেখার স্টাইল চমৎকার, খানিকটা ফিচারধর্মী, অবশ্য একথা বললে সরলীকরণ হয়ে পড়ে। আরেকটু ভালভাবে বললে, উনি যা করেন, একটা স্টেটমেন্ট দেন, তারপর সেটাকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে গল্পের বুনোট।

একটু অবাক করা ব্যাপার হলো, বইটির মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি আমি। অথচ এমনটা হবার কথা নয়। গ্রন্থ হিসেবে বের হবার কথা ছিলো গতবইমেলায়, তার মানে তখুনি একটা বই হিসেবে এটা তৈরিই ছিলো, কিন্তু বের হয়েছে এবারের বইমেলায়। মাঝখানে অন্তত এক বছর সময় ছিলো, এর পরেও বইটির কোথাও তাড়াহুড়োর চিহ্ন আশা করিনি।

গল্পের যে মূল চরিত্র, মানে কথক, তার সাথে একাত্ম বোধ করার জন্যে যথেষ্ঠ সময় দেননি লেখক। পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিলো, খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছি যেন, ঘটনাগুলোও আমার পরিচিত, জানা, কিন্তু কোনটাই যেন ঠিক আমার ঘটনা নয়, যেন দেয়ালে লাগানো স্ক্রাপবুকের মত করে আঠা দিয়ে সাঁটা বিচ্ছিন্ন কিছু ছবি দেখে চলেছি আমি। এই ব্যাপারটাতেই আমার মনে হয়েছে, আরেকটু যদি আপন আপন করে তুলতেন চরিত্রটাকে, আরেকটু যদি আমি-আমি!

অবশ্য, বইয়ের পরিচিতি দিতে গিয়ে ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, এটি একটি ডকুফিকশন। এ কথাটা মাথায় রাখলে উপরের অনেক অভিযোগই খন্ডিত হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও আমার মতে, এটিতে ফিকশনের চেয়ে ডকু-র পাল্লাই ভারী থেকে গেছে!

আর, বইয়ের চেহারা ছবি নিয়ে বেশ দুঃখ পেলাম। খানিকটা এতিম এতিম লেগেছে বইটিকে। প্রকাশনায় যত্নের খানিকটা অভাব ছিলো যেন। বইয়ের ফরম্যাটিং অমনোযোগের ছাপ নিয়ে এসেছে, কাটা বা বাঁধাইয়েও পাশ মার্ক পাবে টেনেটুনে। ঠান্ডা, বা ভন্ড- এ ধরণের শব্দগুলোর "ন্ড" আসেনি একটাও, ফ্ল্যাপের সব গুলো "ণ" সপাটে হয়ে গেছে "ন", আর মায়িশা নামটা অনেক জায়গায় হয়ে গেছে মালশা! বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি যে বাক্যগুলো কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতেও রয়ে গেছে অনেক ভুল। আরও দুঃখ পেয়েছি, বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিভিন্ন রকমের স্পেসিং দেখে, দু লাইনের মাঝের ফারাক কোথাও কম, কোথাও বেশি। হাতে এক বছর পাবার পরেও বইটির উঠ-ছেঁড়ি-তোর-বিয়া ধরণের গেটআপ মনঃপুত হয়নি আমার।

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বইটি হাতে পেয়ে মনে হলো, লেখক ও প্রকাশক এই বেচারা পাঠকের উপরে সুবিচার করেননি তেমন।
তবে আমি জানি, খুব ভাল করেই জানি যে হাসান ভাইয়ের হাতে জাদু আছে। পরবর্তী বইয়েই তিনি আবার তাঁর মত করে ফিরে আসবেন বলেই আশা রাখি।

Thursday, June 04, 2009

আহত ভারতীয় ছাত্র এবং অজিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ-

আমার সহকর্মী ভারতীয় ছেলেটা আমাকে উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি গিয়েছিলে আজ, ফেডারেশন স্কয়ারে?
আমি কী একটা খুটখাট করছিলাম কম্পিউটারে। ওর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ঘটনা খারাপ, পাশের চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলে জানালাম, না যাইনি, আমি তো সকাল থেকেই এখানে। কী খবর বলো তো?
ও বেশ উঁচু গলায় হড়বড় করে অনেক কথা বলে গেলো। সারমর্ম এরকম, আজ নাকি প্রায় হাজার পাঁচেক ভারতীয় ছাত্র প্রোটেস্ট করেছে সেখানে। পুলিশের সাথে ব্যাপক কথা কাটাকাটি হয়েছে। প্রায় নাকি মারামারি হবার জোগাড় কয়েকবার। ছাত্রদের অভিযোগ ভিক্টোরিয়ান পুলিশ ততটা সক্রিয় নয় নিরাপত্তার ব্যাপারে।

মাত্র কদিন আগের ঘটনা। একটু রাতের দিকে স্টেশানে নেমে বাড়ি ফিরছিলো কয়েকজন ভারতীয় ছাত্র। সেখানে হুট করেই ওদেরকে আক্রমণ করে বসে বেশ কিছু ককেশিয়ান যুবক। আক্রমণটা হেলা ফেলা করার মত নয়। মেরে ধরে সাথে যা ছিলো সবই কেড়ে নেয়া হয়েছে, এবং সেই সাথে দু জনকে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে। আমি সেদিন টিভিতে ভিডিও দেখেছিলাম কিছু, দেখে শিউরে উঠেছিলাম, বুকের মাঝামাঝি থেকে একেবারে পেটের তলদেশ পর্যন্ত চিরে ফেলেছে একজনের। তার অবস্থা ভয়াবহ। টিভিতেই দেখালো যে ডাক্তার বলছে বাঁচবে কি না নিশ্চিত নয়। অন্যজনের অবস্থাও তদ্রুপ।

ঘটনার আকস্মিকতায় লোকজন বেশ চমকে গেছে এখানে। ভারতীয় ছাত্ররা বেশ ক্ষেপে গেছে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তারা খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে, অস্ট্রেলিয়রা বর্ণবাদী।
ভিক্টোরিয়ান পুলিশ খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে এই মুহুর্তে, তারা বলছে, ঘটনার কারণ আসলে বর্ণবাদ নয়, এর পেছনে দায়ী এলকোহল।

আমি যা বুঝি, দুই পক্ষই মোটামুটি ঠিক।
আক্রমণ যারা করেছে, তাদের সোজা বাংলায় আমরা জান্কিজ বলি। এরা সারাদিন মদ খেয়ে পড়ে থাকে, মূলত রেল স্টেশানের আশপাশেই। অথবা ড্রাগ নেয় কিছুটা আড়ালে পড়া জায়গাগুলোয় দাঁড়িয়ে। এবং পুলিশ দেখলেই ভদ্র হয়ে যায়, অথবা দৌড়ে পালায়। পুলিশের দাবি সত্য, কারণ আক্রমণ করেছে এরকমই জান্কিজদের একটা দল। কিন্তু ছাত্রদের কথাও সত্য এ জন্যে যে, এই জান্কিজরা ওদের ধরেছে ওরা বাদামী চামড়ার বলেই। সাদা চামড়া হলে কখনোই ধরতো না। এ ক্ষেত্রে আমি বলবো, জান্কিজরা বর্ণবাদী নয় ঠিক, অনেকটা সহজ শিকার হিসেবে বাছাই করেছে ছাত্রদের।

আমি নিয়মিত পত্রিকা দেখতে পারিনি কদিন। এই ঘটনা নিয়ে যা কিছু শোনা, বেশিরভাগই পরিচিত ভারতীয় ছাত্র বা সহকর্মীদের কাছ থেকে।
বিশেষ করে ভারতে নাকি এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ঘটনার সত্যতা জানি না, দিল্লীতে নাকি অজি রাস্ট্রদূতকে তলব করে তিরস্কার করা হয়েছে। এখানে টিভিতে দেখলাম ভারতীয় রাস্ট্রদুত হাসপাতালে গিয়েছেন আহত ছেলেটাকে দেখতে, এবং পরে নাকি সংবাদ মাধ্যমের বেশ অনমনীয় বক্তব্য রেখেছেন।

ছাত্রদের এরকম প্রতিক্রিয়া আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগেনি একদমই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ কয়েকজনকে চিনি যারা এরকম হ্যারাসমেন্টের শিকার। আমার পরিচিত একজনকে একবার মেরে হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো, ঊনি ছয় মাস হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আরেকজনের কথা জানি যাকে স্যাটারডে নাইটে রাস্তায় একা পেয়ে একদল ছেলে পেলে ঘিরে ধরে গায়ে বিয়ার ঢেলে দিয়েছে।
ইন্টারেস্টিং হচ্ছে এরকম ঘটনা কিন্তু হরহামেশাই ঘটছে। বিশেষ করে মূল শহর থেকে একটু দুরে যেসব উপশহর ( সাবআর্ব) রয়েছে, সেখানকার নির্জন স্টেশানগুলোয় এরকম প্রায়শই ঘটে। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা নিয়ে এত তোলপাড় হবার কারণ, সম্ভবত, এবারই প্রথম ভিক্টিমকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে মুমূর্ষু অবস্থায়।

এদিক ওদিক থেকে ভারতীয় অনেক ছাত্রের নানা অভিযোগ এতদিনে সবার নজরে এলো।
বেশিরভাগেরই অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। একজন বললো, রাতে বাড়ি ফিরতে গেলে জান্কিজরা উৎপাত করতো, পুলিশের কাছে অভিযোগ করায় তারা নাকি বলেছে, বাসা বদলে ফেলো!
টাকা না পেয়ে মারধর করেছে, এই অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশের উত্তর হলো, সবসময়ে সাথে কিছু টাকা-পয়সা রাখো।
ফেডারেশন স্কয়ারের প্রোটেস্টের সময় অনেক ছাত্রই পুলিশের উদ্দেশ্যে মধ্যমা প্রদর্শন করেছে নির্বিকারে। কেউ কেউ বলেছে, পুলিশ যদি না পারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাহলে সেটা খোলাখুলি জানিয়ে দিক, আমরা নিজেরাই সেটার ব্যবস্থা করবো।

পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে আসলেই মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আমার বাসায় একবার চুরি হয়েছিলো বেশ অনেকদিন আগে। পুলিশ ডাকার পরে ওরা আমাকেই হাজারো প্রশ্ন করে প্রায় নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলো, তারপর লম্বা সময় ধরে দরজা জানালা থেকে হাতের ছাপ টাপ নিয়ে চলে গিয়েছিলো। এরপরে আর কোন হদিশ পাইনি।
এ দেশে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করা আর পার্কিং ফাইন দেয়া ছাড়া পুলিশের সত্যিই আর কোন কাজ আছে কি না আমার প্রায়শই সন্দেহ হয়।

এই ঘটনাটায় লোকেদের টনক নড়েছে বোঝা গেলো। নড়েছে সরকারেরও, অবশ্য তা ছাড়াও উপায় নেই। যদ্দুর জানি, শিক্ষা "রপ্তানী" করে, অর্থাৎ এই বিদেশী ছাত্রদের কাছ থেকেই প্রতি বছর বিরাট অংকের টাকা আসে অস্ট্রেলিয়ায়, যাদের বেশিরভাগই ভারতীয়।

তাই আর্থিক লাভের কারণেই হোক, অথবা নিজেদের বর্ণবাদী অপবাদ ঘোচানোর জন্যেই হোক, আমি সত্যিই আশা করছি এবারে এর একটা সমাধান এদেশের সরকার নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।

Tuesday, May 26, 2009

হাওয়াই মিঠাই ১৪

সূর্য বললো ইশ, তুই খাস কেন কিসমিস?
এখানকার আবহাওয়াটা সম্ভবত কোন কারণে খুব কনফিউজড হয়ে আছে। কখন কেমন আচরণ করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। বাইরে ঝাঁ চকচকে রোদ, কিন্তু বেরুলেই দেখা যায় সে রোদে কোন তাপ নেই। আমি মনে মনে একচোট হেসে নিই এসব দেখলে। নরকে শুনেছি এমন আগুন থাকবে, তাতে কোন আলো নেই, কিন্তু তাপে সেটা গনগনে হবে। এই রোদের ঠিক উল্টো আচরণ দেখে ভাবি, লোকে এবারে এ জায়গাটাকে স্বর্গ বলে ভুল না করে বসলেই হলো।
আলাপের বিষয় খুঁজে না পেলে নাকি আবহাওয়ার আলাপ দিয়েই শুরু করতে হয়। আমি বুঝছি না, আমিও কি সেই পন্থাই ধরলাম? কিছু না পেয়ে শেষে রোদ-সূর্য নিয়ে পড়লাম?
অথবা, হয়তো আমিও এখানকার সূর্যের মতই কনফিউজ্ড হয়ে আছি। রাতের বেলা হিটার আর পাখা দুটা জিনিসই বিছানার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখি। হুট করে ঘুম ভেঙ্গে গেলে প্রয়োজন মত সুইচ টিপে দিই, ব্যস, আবহাওয়া বদলে যায়।
গত কদিন ধরে ভাবছি, আমার হাতে আসলে আরও কিছু সুইচ থাকা খুব দরকার ছিলো। অন্তত, ইচ্ছে হলেই যদি চারপাশের দেশটা বদলে ফেলতে পারতাম!

বাসা ভেঙ্গে বাক্স বানাই
চার মাস আগে আমার ফেইসবুকের স্ট্যাটাস ছিলো এরকম কিছু।
চারমাস আগে আসলে বাসা বদলাচ্ছিলাম। এটা একটা বিরাট যন্ত্রণা। দেখে মনে হয় কিছুই না, কিন্তু সব কিছু একটা একটা করে গোছাতে গেলে দেখা যায় রাজ্যের জিনিস জমে গেছে। সব কিছু ঠাসাঠাসি করে বাক্সে ভরো, তারপরে সেটা নিয়ে চলো নতুন বাসায়, তারপরে সেসব বাক্স থেকে বের করে নিয়ে আবার সাজাও নতুন করে।
আমি অলস প্রকৃতির মানুষ। কোথাও ঠেলে ঠুলে নিজের জায়গা করে নিতে পারলে আর কিছু চাই না। সহজে নড়তে চড়তেও চাই না। কোন একভাবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো। কিন্তু সেটা মানুষের সহ্য হবে কেন? মন খারাপ
বাড়িওয়ালী নোটিশ দিয়েছে, দু মাসের মধ্যে বাসা ছাড়ো। সম্ভবত কিছু ঘষামাজা করে নতুন করে বাড়তি ভাড়া বসাবে। এ জন্যে পুরো বিল্ডিং-এর ছয়টা ইউনিটের সবাই দুম করে আমরা বাস্তুহারা কমিটির সদস্য হয়ে গেলাম!
একদম মহা বিপদে পড়েছি।
এখানে বাসা ভাড়া পাওয়া সোনার হরিণের কাছাকাছি ব্যাপার। তার উপরে মাত্রই কদিন আগে নতুন বাসায় এসে সবে স্থিত হয়েছি, এখন আবার বাসার খোঁজে দৌড় ঝাঁপ অসহনীয় লাগছে!
আমার দৈনন্দিন রুটিনে বেশ বদল ঘটে গেছে। রোজ রাতে কাজ থেকে ফিরে নেটে বাসা খুঁজে বেড়াই। সকালে উঠে কাজে যাবার আগে আবার লিস্টি মিলিয়ে সেগুলো দেখে আসি। কিন্তু মন মতন হয় না একটাও। বাসা ভাল হলে দেখা যায় ভাড়া সাধ্যের বাইরে। ভাড়া দেখে খুশি হয়ে দেখি বাসার অবস্থা সুবিধের নয়।
আমরা দুই বুড়ো-বুড়ি এখন সকাল বিকেল কোরাসে হা-পিত্যেশ করি। জীবনে ভালবাসার কোন অভাব নেই আমাদের, কিন্তু একটা ভালো বাসার আজ বড়ই প্রয়োজন!

Monday, May 04, 2009

পুরনো প্রেমিকাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে-

উহুঁ, আলাদা ফিস-টিস নেই
চাইলে, হাতে লেখা সাদা কাগজের একটা
ফরম দিতে পারি।
সেখানে নাম-ধাম লিখে-
সাথে পিতার বৈষয়িক বৃত্তান্ত,
এবং নীল না পেলে না হয় সাদা খামে পুরেই
আমার বুক পকেটে ফেলে যেও মেয়ে।

শুধু তোমার জন্যই, জেনো,
শুধু তোমাকে ভেবেই আমি
কাগজে বিজ্ঞাপন দেইনি কোনও।
নইলে দু"কলামে রঙীন হরফে
ছেপে দেয়াই তো যেতো-
"কবি-র প্রেমিকা পদে লোক নিয়োগ হচ্ছে।"

হাওয়া শুঁকে শুঁকে আমি টের পেয়ে গেছি,
আমার পুরনো সব প্রেমিকাদের ইদানিং
সার বেঁধে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

--------------
৪ মে, ২০০৯

Sunday, April 26, 2009

ঈশ্বর যেখানে অবশ্যই উপস্থিত-

অল্প কয়বছর হলো আমি খানিকটা সুস্থির হয়েছি, তার আগে, যখন ছোট ছিলাম, অথবা এমনকি কলেজে থাকাকালীনও, যাবতীয় রোগ বা অসুখের আমি খুব প্রিয় ছিলাম। যখন যে রোগের চল দেখা যেত, আমি বীরত্বের সাথে সেই রোগ বাঁধিয়ে বসতাম।


ক্লাস সেভেনের থার্ড টার্মে, আমাদের কলেজে একধারসে অনেকের চিকেন পক্স হয়ে গেলো। ক্লাসের বন্ধুরা একেকদিন ক্লাসে আসে, লানচের পরে গেমসে যাবার সময় দেখি হাসপাতালের বারান্দা থেকে তাদের বিগলিত হাসি। কী হয়েছে? না, ওনারা চিকেন পক্স বাঁধিয়ে বসেছেন। আগামী একুশ দিন তাদের কলেজের যাবতীয় পিটি-প্যারেড-পাঙ্গা থেকে ছুটি! কি মজা, আমি নিশ্চিত যে আমারও হবে। কিন্তু টার্ম প্রায় শেষ হতে চললো আমার পক্সের কোন লক্ষণ নেই। বিরক্ত হয়ে ভাবছি ব্যাপার কী? তো, টার্ম শেষের তিন দিন আগে পক্স বাবাজী ভাবলেন, এ ছেলেকে হতাশ করে কী লাভ? তিনি আমাতে অবতীর্ণ হলেন। সবাই যখন ছুটিতে যাবার আনন্দে মশগুল, আমি তখন বিরস বদনে হাসপাতালে গেলাম।
একুশ দিনের ছুটির আঠারো দিনই আমার ঘরবন্দী কেটে গেলো, বিছানায়।

এরকম কম ঘটেনি। হাত-কাটা বা পা-ভাঙ্গা, এসব সাধারণ ঝামেলা বাদেও আমি নিজ থেকে আরও ভয়াবহ সব অসুখে পড়তাম নির্দ্বিধায়!
এর ধারাবাহিকতা কাটলো না কলেজ থেকে বেরুবার পরেও।
২০০০ সাল। পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে আমরা তখন ঢাকায় নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়ানোয় ব্যস্ত। আমার মত মফস্বলের ছেলেরা কেউ মেসে, কেউ বা আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। আমিও তাই।
তো এরকমই এক সুন্দর বিকেলে, বাইরে তখন কন্যাসুন্দর আলো, এরকম সময়ে নাকি লোকের মাথায় প্রজাপতি বসে। আমি অভাগা মানুষ, প্রজাপতি কপালে নাই, তাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আমার ঘাড়ের পাশে এসে টুক করে বসলো এক….। হু, কী আবার, এক ডেঙ্গু মশা! তিনি এসে হাল্কা আদরে আমার চামড়ায় হুল ফুটিয়ে দিলেন, আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলাম।
এরকমটা অবশ্য আগেই ভেবেছিলাম। কারণ সে বছরই কেবল এই বিদঘুটে নামের জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললে চমকে উঠতাম, নানা জায়গায় অনেক লোক মরছে, মৃতদের নামের তালিকায় কয়েকজন ডাক্তার থাকায় লোকেদের আতঙ্ক একেবারে তুঙ্গে। আমি আগেই বুঝেছিলাম, এরকম একটা মহিমান্বিত অসুখ আমার না হয়ে যাবে কোথা?

হলো, কদিন জ্বরে ভুগলাম। কেউ অবশ্য শুরুতে বুঝলো না যে এটাই ডেঙ্গু। কুমিল্লা থেকে মামা এসে আমাকে নিয়ে গেল বাসায়। সেখানে গিয়েও জ্বর কমে না। দুদিন পরে শুরু হলো অসহ্য হাড়ব্যথা। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে। ডাক্তার এলেন, নানান পরীক্ষা চালালেন, নার্স এলেন ইন্জেকশান নিয়ে। এসে তিনি সুইয়ের বদলে সোজা আমার দিল মে চাক্কু বসিয়ে দিলেন!
কানে কানে বলি, ডেঙ্গুর প্রকোপে আমার তখন জান যায় যায়, তার মধ্যেও পষ্ট বুঝলাম, জীবনে এর চেয়ে সুন্দরী নার্স দেখা আমার কপালে নাই। সাদা পোষাকে যেন সাক্ষাৎ হীরামনের গল্প থেকে উঠে আসা পরী।
হায়! সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টিকলো না। ডাক্তার ধরে ফেললেন, মানে, আমাকে না, আমার অসুখকে। তিনি বাংলা সিনেমার জাজদের চেয়েও বেশিরকম বিষন্ন সুরে ঘোষনা দিলেন, মহাশয়ের ডেঙ্গু হয়েছে।

আমি শুনে বেকুব হয়ে গেলাম। মাথার মধ্যে ঘুরছিলো পত্রিকা আর টেলিভিশনে দেখা মৃত্যুসংবাদগুলো। আমার বাসার সবার অবস্থাও কাহিল। মোটামুটি মরাকান্না জুটিয়ে দিলো সকলে। এর মধ্যেই এম্বুলেন্সে করে আমাকে নিয়ে আসা হলো ঢাকা মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে।
সেখানে বেশ কদিন ছিলাম। ভাল হয়ে উঠেছিলাম আস্তে আস্তে। তবে সে অন্য গল্প। আজ আর ওদিকে যাবো না।
এসব কথা আজ হুট করে মনে পড়ে গেলো ফেইসবুকে একটা ভিডিও দেখে। ঢাকা মেডিক্যালেরই সেটা। যেখানে রাত গভীর হলে ওয়ার্ড বয় আর সুইপাররা ডাক্তার বনে যান। অষুধ প্রেসক্রাইব করাই শুধু নয়, ওনারা অপারেশনও করেন!



ভিডিও দেখে আমি নিজের ভাগ্যকে হাজার কোটিবার ধন্যবাদ দিলাম, এই সময়ে আমাকে অসুখে পড়ে সেখানে যেতে হলো না বলে। ধন্যবাদ দিলাম সেই রূপবতী ডেঙ্গু মশাটাকেও, আর নয় বছর দেরিতে কামড়ালেই আমাকে আর দেখতে হতো না।
ঈশ্বরবিশ্বাসীরা প্রায়শই নাস্তিকদের সোজা পথে আনানোর জন্যে নানান আলামত হাজির করেন। এই ভিডিও দেখে আমার মনে হলো, সেসবের কোন দরকারই নেই। তাদের সবাইকে একবার করে ঢাকা মেডিক্যালে ঘুরিয়ে আনা হোক। ওয়ার্ড বয় বা সুইপারের হাতে অপারেশন হবার পরেও স্বয়ং ঈশ্বর ব্যাতীত আর কেউ তাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, আর যে করুক, আমি অন্তত এ কথা বিশ্বাস করি না!

Thursday, April 23, 2009

গল্পঃ কাঠের সেনাপতি

আব্বার সাথে রাশেদের আজ আশ্চর্য শত্রুতা। আজ সারাদিন, দিনমান। ছোট্ট চায়ের টেবলের দু'পাশে ওরা দু'জন ঠিক দুই যুযুধানের মতন দাবার গুটি নিয়ে বসে আছে সকাল থেকে। কখনও গালে হাত, কখনও বাঁকানো ভ্রু, কখনও চুপচাপ।
আব্বার অফিস ছুটি আজ, রাশেদের ইশকুলও তাই। ওদের সারা ঘরে ছুটির আমেজ এলিয়ে আছে, বসার ঘর থেকে রান্নাঘর, সেখান থেকে বারান্দায়, সবখানে। আপাতত শুধু ছুটি নেই দুজনের মাথার ভেতর, তুমুল তান্ডব তাতে, যুদ্ধ পরিকল্পনায় ব্যস্ত, আর বাইরে তবু বেশ নিরাবেগ, অথবা ভঙ্গিটা সেরকমই, খাঁজ কাটা সুন্দর কাঠের সাদা কালো সৈন্যদের ওরা লেলিয়ে দেয় একে অপরের দিকে। একটা অদ্ভুত দৃশ্য যেন টুপ করে বসে পড়ে টেবলের চারপাশ ঘিরে, যেন ঢাল-তলোয়ার হাতে দুই সৈন্য, যুদ্ধের ময়দানে পরস্পরের মুখোমুখি।

দাবা, আসলে বুদ্ধিরই খেলা, দু'জনের কেউই তাই হার মানতে রাজি নয়। কেউ কেউ জানে, কেউ জানে না, দাবার ছক কাটা বর্গাকার ঘরগুলোকে পেরিয়ে যেতেও বাস্তবিক, যোদ্ধাসুলভ একটা দক্ষতার খুব প্রয়োজন হয়। আব্বার সাদা গুটি হয়ত পেছন থেকে তাড়া করে আসতে থাকে রাশেদের কালোর দিকে, আর রাশেদ তখন তার অলক্ষ্যে কাগজের ময়দানের অন্য কোন পার্শ্বে হয়তো তার অন্য কোন গুটি মেরে ফেলার তীব্র ষড়যন্ত্রে টগবগ করছে!

তাদের এই লড়াইয়ের মূল দর্শক রাশেদের আম্মা। দু'জনের ঠিক পাশেই একটা ইজি চেয়ারে আম্মা শুয়ে-বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে চা খাচ্ছে। পা দোলানো এবং চা খাওয়া, এই দুটো কাজ একসাথে কী করে হয় এই নিয়ে অনেক ভেবেছে রাশেদ, কিন্তু কোন কূল কিনারা পায়নি, যেমন পায়নি খেলার সময় আব্বার ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠা মুখের কারণও।

আম্মাকে জিজ্ঞেস করে রাশেদ, আম্মা, তুমি কার দলে, আমার না আব্বার?
আম্মা চা খাবার ফাঁকে ফিক ফিক করে হাসে। বলে, ইশ, আসছে রে আমার সোহরাব আর রুস্তম!

ঘরের পাশটিতেই একটা লম্বা ছাতিম গাছ। লম্বা মানে উঁচু, অনেক উঁচু; মোটামুটি চারপাশের সবাইকে ছাড়িয়ে সোজা ওপরে উড়াল দেবার চিন্তায় মশগুল সে। বাইরে থেকে বাউন্ডুলে হাওয়ারা মাঝে মাঝে ছাতিম গাছটার কাছ থেকে তীব্র কিছু গন্ধ ধার করে নিয়ে আসে ঘরে। সেই গন্ধ বাপ-ব্যাটার এই যুদ্ধক্ষেত্রে বারুদের গন্ধ হয়ে ভেসে বেড়ায়। দুয়েকটা পথভোলা চড়ুই যখন ঘরে ঢুকে পড়ে বেরুবার আর জায়গা পায় না, তারপর অস্থির হয়ে এ দেয়াল থেকে ও দেয়ালে ছুটে বেড়ায়, রাশেদের মনে হয়, ওরা যেন গুপ্তচরের মত টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে শত্রুপক্ষের খবর নিতে।

বসার ঘরে, এই দুই অসমবয়েসী সেনাপতির গম্ভীর যুদ্ধের আর একজন দর্শকও আছেন। দৃশ্যপটে উপস্থিত তিনি, তবে এক পাশে, মানে বাম দিকের দেয়ালে তিনি বসে, একটা আঙুল শূণ্যে উঁচিয়ে অনেকগুলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা কালো কোট পরণে তাঁর, একটা চারকোণা ফ্রেমের কালো চশমা, কাঁচা পাকা গোঁফ। সামনের মানুষগুলোর মুখ স্পষ্ট নয়, রাশেদ তবু যতবার এই ছবির দিকে তাকায়, মনে হয়, প্রত্যেকেই কেমন যেন ঘোরের মধ্যে আছে তারা। একটা সম্মোহনী দৃষ্টি নিয়ে তারা তাকিয়ে আছে সবাই কালো কোটের দিকে। বাঁশী নেই হাতে, তবু শৈশবের অনেকগুলো দিন রাশেদ ভেবে এসেছে, এই ছবির লোকটাই হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা।

এই ছবিটা আব্বার খুব প্রিয়। এরকমই জানে রাশেদ, তবু মাঝে মাঝে খানিকটা গোলমেলে লাগে ওর কাছে। যখন কোন কোন রাতে খুব শ্রান্ত হয়ে আব্বা বাড়ি ফিরে, এবং হয়ত দাপ্তরিক কোন কাজে তার ভীষণ বিরক্তি এসেছে, হয়তো কোন কারণে খুব ক্ষিপ্ত কারও ওপর, আব্বা কাপড় না বদলেই সোজা ঐ ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, অনেকক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে, নির্নিমেষ, চোখে অভিমান, তাই কী? রাশেদ নিশ্চিত নয়।

বারুদের গন্ধ চারপাশে, যুদ্ধের ময়দান, ফুরসত নেই, তবু দাবার বোর্ড থেকে মাঝে মাঝে চোখ সরিয়ে নিয়ে রাশেদ দেখে, ছবির ভেতরকার সেই সুদর্শন মানুষটার মুখের ভাবের কোন পরিবর্তন হয় না, অবিচল একই ভাবে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি, আর ছবির বাকি মানুষেরাও একই ভাবে মন্ত্রমুগ্ধের মতন তাকিয়ে থাকে সেই আঙুলের দিকে, যেন নড়ে উঠলেই, একটা খুব গভীর কিছু হয়ে যাবে, একটা ভীষণ ওলট পালট কিছু।

আব্বা খুব সময় নিচ্ছে আজ প্রতি চালে, মাথা একটু ঝুঁকিয়ে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে সারাক্ষণ। রাশেদ একটু অস্থির হয়ে ওঠে। ও গলায় তাড়া এনে বলে, আব্বা, চাল দাও।
টিভিতে তখন অনেক পুরনো দিনের ছবি দেখাচ্ছে, অগণিত সাদা কালো মানুষের ছড়াছড়ি; অনেক চীৎকার, সবাই খুব দৌড়ুচ্ছে দিকবিদিক, মাঝে মাঝে গুলির শব্দও। আব্বা তার মাঝ থেকেই মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে, হুম, দিচ্ছি।

মজার ব্যাপার হলো, ও নাকি পড়তে চাইতো না ছোটবেলায়, কিন্তু কি আশ্চর্য, বড় হতে হতে রাশেদ ক্রমশ উইপোকা বনে যায়। একেকটা বই হাতে পেলে দিন রাত ভুলে গিয়ে সারাদিন শুধু পড়তে থাকে। আম্মা খানিকটা বকা ঝকা করে এই নিয়ে, কিন্তু আব্বা খুব খুশি।
পড়তে পড়তে, কোন একদিন, সম্ভবত সেদিন ছাতিমের গন্ধ আবারও ভুল করে ঢুকে পড়েছিলো ওদের ঘরে, দুয়েকটা চড়ুইয়ের ডানায় চেপে। আর রাশেদ সেদিন, ওর আশপাশে চড়ুইয়ের মতই উড়তে থাকা অনেকগুলো ওলটপালট শব্দকে ধরে ধরে খাতায় বসিয়ে দিয়েছিলো। বিকেল হলে আব্বা যখন বাড়ি ফিরে, রাশেদ ভীষণ সংকোচে সেই সার-বাঁধা চড়ুইগুলো নিয়ে আব্বার সামনে হাজির হয়, আর আব্বা সেদিকে এক পলক তাকিয়েই বলে ওঠে, ওরে বাবা, কী সর্বনাশ, তুই কবিতা লিখে ফেলেছিস!

তারপরে একটা কান্ড হলো, রাশেদকে প্রায়শই লজ্জায় ফেলে দিয়ে আব্বা ওদের বাসায় বেড়াতে আসা সব অতিথিদের একদম ঢাক বাজিয়ে জানিয়ে দিতো যে ও ইদানিং কবিতা লিখে। কী লজ্জা কী লজ্জা! একবার শীলু খালাদের বাসায় ওরা বিকেলে বেড়াতে গেছে, চা খেতে খেতে আব্বা ঠিক ফুটবল রেফারীর তীব্র বাঁশীর মত করে ঘোষণা দিয়ে বসলেন, শীলু, আমাদের রাশেদ তো খুব সুন্দর কবিতা লিখে।
রাশেদ তখন কেবলই একটা মজার বিস্কুট মুখে তুলেছে, সেখানেই ওর হাতটা আটকে যায়। শীলু খালা উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, তাই নাকি রে রাশেদ, সত্যি?
ও কিছু বলার আগেই আব্বা বলে ওঠে, হ্যাঁ তো, এই রাশেদ, এক্ষুণি একটা কবিতা লিখে দে তো।
ওর রীতিমত কান্না পেয়েছিলো তখন। আব্বাটা এমন বোকা কেন? এরকম হুট করে যে কবিতা লেখা যায় না এটা আব্বা জানে না!
শীলু খালা ঠিক বুঝতে পারে, বলে, থাক থাক, এখুনি লিখবে কি? সময় লাগে না ওসবে? পরে লিখে আমাকে দেখালেই হবে।

এই সব ভাবতে ভাবতে কালো ঘরের হাতিটাকে আব্বার নৌকার কোনাকুনি তিন ঘর পেছনে এনে বসায় রাশেদ। একটা শুষ্ক হুমকির মতন ওটা সেখানে বসে থাকে। রাশেদ আড়চোখে তাকিয়ে দেখে, আব্বার মাথার চুল এমনিতেই সব এলোমেলো হয়ে আছে, আর এবারের চাল দেবার পরে চোখ একবার ছোট হয়ে যাচ্ছে, আবার বড়ো। চালটা তাহলে বেশ ভাল হয়েছে, ভাবতে থাকে সে।

রাশেদের কবিতারা আজকাল যত্নে গড়া একেকটা পাখির বাসার রূপ নিচ্ছে প্রায়শই। একদম আনাড়ি বা পাখিদের ওড়াওড়ি আপাতত নেই আর ওগুলোয়। তারচেয়ে বরং বেশ আরামপ্রদ চেহারা পাচ্ছে কবিতাগুলো, পড়তেও প্রশান্তিবোধ হয়, আব্বার ভাল লাগে। সেগুলো পড়বার সময় আব্বার ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে রাশেদ মনে মনে ভাবে, একদিন কোনদিন রাশেদ আব্বার যুদ্ধজীবনের গল্প নিয়েও এরকমই পাখির বাসা বানাবে, নিশ্চয়ই।

দু'জনের মাথায়ই নির্ঘাত এরকম বিচ্ছিন্ন ভাবনারা নাগরদোলার মতন দুলতে থাকে, কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ নেই একদম। বরং দ্বৈরথ ক্রমশ জমে ওঠে। যুদ্ধ পরিকল্পনা বদলে বদলে যায়। অদৃশ্য বর্মের আড়ালে দুজনের দৃশ্যমান ঘাম আম্মাকে বেশ আনন্দ দেয়। আম্মা আরেক কাপ চা আনতে ভেতরে যায় তখন।

সপ্তাহের মাঝামাঝি এরকম আলটপকা ছুটির দিনগুলো কীরকম ছটফটে ভালোলাগায় কেটে কেটে যায়। পাড়ার মাইকে আজ সারাদিনই গমগমে কন্ঠের বক্তৃতা বাজছে, চলতি বাংলায় কেউ একজন প্রাণোচ্ছ্বল ভঙ্গিতে কথা বলে যাচ্ছেন। আর সোফার অন্য পাশে বসে রাশেদ দেখতে পাচ্ছিলো দেয়ালের ওই লোকটাই কেমন করে যেন টিভির ভেতরে আজ ঢুকে পড়েছেন, প্রায় সারাক্ষণই ঘুরে ফিরে তাঁকেই দেখা যাচ্ছে পর্দায়। মাঝে মাঝে সাথের মানুষদেরও। ওখানে উনি হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছেন, আর এক সমুদ্র মানুষ সেখানে তাঁর সাথে সাথে সাড়া দিচ্ছে।

ঠিক সামনে বসেই খেলছে আব্বা, তবু যেন মাঝে মাঝে সেই জনসমুদ্রের মাঝখান থেকে তাকে তুলে আনছিলো রাশেদ। ও বুঝতে পারে, আনমনা হয়ে থাকা আব্বার আজ খেলায় একদমই মন নেই, এর মাঝে একটা ভুল চাল দিয়ে ফেলেছে, এবং অন্য যে কোন দিনের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে আব্বা সেটা এখনও টের পায়নি। যখন মৃদু স্বরে রাশেদ ডাকছিলো মাঝে মাঝে, আব্বা তখন যেন ঠিক দেয়ালের ওপাশ থেকে সাড়া দিচ্ছিলো।
ক্রমশ খেলা জমে ওঠে। যুদ্ধ থামে না ওদের, বরং চাল পাল্টা চালে সেটা দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগুতে থাকে। রাশেদদের বসার ঘরে ছাতিমের গন্ধ, আর টিভির ভেতরে একটা মানুষ, হাজার মানুষ, লাখো মানুষ নড়ে চড়ে যায়।

টিভি পর্দায় হুট করে একটু আলোড়ন হয়। সেই চশমা পড়া লোকটাকে দেখা যায় একটা ধবধবে সাদা রঙের বিমান থেকে নামছেন। আব্বা এবারে ঘাড় ফিরিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই কালো কোট আর চারকোণা চশমার দিকে। রাশেদ টের পায়, হুট করেই আব্বার মন সরে গেছে যেন, সাদা রঙের মন্ত্রীটা দুম করে খেয়ে ফেলে সে, কিন্তু কোন ভাবান্তর দেখে না প্রতিপক্ষের, তার চোখ তখনো অপলক টিভি পর্দার সাদা-কালো ছায়ার দিকে।

চারপাশ খানিক দেখে শুনে নিয়ে রাশেদ তার ঘোড়া এগিয়ে দেয় আব্বার সাদা রাজার দিকে। ঘোড়ার সঙ্গী হয় রাশেদের মন্ত্রী, অন্যপাশে রাজার পিছুবার পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে একটা শুটকো পটকা হাতি। আব্বা একবার চোখ ফিরিয়ে তাকায় সেদিকে, ভুরু বেঁকে যায়। রাশেদ একটা মুচকি হাসি দেয়, এটা একেবারে মোক্ষম একটা চাল। আব্বা একটু ঝুঁকে আসে দাবা বোর্ডের দিকে, আব্বাকে কেমন গুটিয়ে পড়া লাগে রাশেদের কাছে, কেমন ছোট হয়ে আছে যেন। কিন্তু সেটা কেবল এক পলকের জন্যে, আব্বা আবারও চোখ ঘুরিয়ে নেয় টিভির দিকে, পর্দায় তখন দেয়ালের ওই লোকটার ছবি। রাশেদ দেখে আব্বা কেমন হাঁসফাস করে ওঠে, তখুনি হঠাৎ পর্দার ছবি বদলে যায়, এতক্ষণের প্রাণোচ্ছল ছবির লোকটাকে হঠাৎই দেখা যায় সিঁড়ির ওপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে, চিরকালীন কালো ফ্রেমের চশমা নেই চোখে, চোখ দুটো বোজা, চুল এলোমেলো। দেয়াল ধরে উড়তে থাকা চড়ুইগুলো কখন যেন থেমে গেছে, ছাতিমের গন্ধটা ঘরের মাঝামাঝি কোথাও মেঝে অব্দি ঝুলে আছে ছাদ থেকে। আব্বার থমথমে মুখ খেয়াল করে না রাশেদ, ও অস্থির হয়ে ওঠে, কিস্তি মাতের চাল, তবু দেখছে না কেন! ও বলে ওঠে, আব্বা, তোমার রাজা বাঁচাও!
আব্বা হঠাৎই সম্বিত ফিরে পায়, চকিতে টিভি থেকে চোখ সরিয়ে দাবার বোর্ডের দিকে কেমন অচেনা দৃষ্টিতে তাকায়। দু'বার বিড়বিড় করে রাশেদের কথার প্রতিধ্বনি করে ওঠে আব্বা, রাজা বাঁচাও, রাজা বাঁচাও!
অকস্মাৎ কী হয় তার, সোজা দাঁড়িয়ে আব্বা অস্ফুট একটা চিৎকার দেয়, আর হাতের এক জোরালো ঝাপটায় মেঝেতে উল্টে দেয় দাবার বোর্ড!

বিমূঢ় হয়ে রাশেদ সেদিকে তাকিয়ে থাকে, মেঝেতে এক পাশে উল্টে পড়ে আছে সাদা রঙের রাজা। চারপাশে কেউ নেই, কিছু নেই, তবু যেন কিছু ছোপ ছোপ রক্ত।

-----------------
মু. নূরুল হাসান
২০ এপ্রিল, ২০০৯

( গুরুচন্ডা৯ পত্রিকায় প্রকাশিত )