Saturday, December 05, 2009

অমিতাভ রেজার নাটক

বাংলাদেশি নাটকে পরিচালকের নাম দেখে নাটক বাছাই করার অভ্যেসের শুরু মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর কল্যাণে। কিন্তু সেই ঊষা লগ্ন এখন গত-প্রায়, এখনও তার নাটক দেখি, কেবল যদি পর্যাপ্ত সময় থাকে হাতে। তারপরেও কিছুটা একঘেয়েমিতে ভুগি, ফারুকীর নাটকের পাত্র-পাত্রীরা সবাইই কেন জানি খুব উচ্চ স্বরে কথা বলে। আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিরাম ঝগড়া করতে থাকে কেউ কেউ, এবং নাটকে মোবাইলের ব্যবহার দৃষ্টিকটু রকমের বেশি, বাংলাদেশে মোবাইলের প্রথম যুগের মত অনেকটা। যেন সবাইই গত পরশু মোবাইল ফোন কিনে গতকাল সারাদিন ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আজ নাটকের শ্যুটিং করতে চলে এসেছে।

তারপরেও নাটক দেখার অভ্যাস এখনও পাকাপোক্ত আছে অল্প কজন পরিচালকের গুণে, তাঁদের একজন অমিতাভ রেজা।

সম্ভবত গত ঈদেই দেখেছিলাম [i]ইকুয়াল টু[/i]। ছিমছাম একটা নাটক, আরজে নওশীন ছিলো অভিনয়ে, নাটকেও আরজেরই ভুমিকা তার। গল্পটা চমৎকার, এবং দেখতে দেখতে বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নালু সময়টায় ফিরে যাচ্ছিলাম।


অবশ্য, অমিতাভ রেজার ভক্ত হয়েছি তারও আগে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্প অবলম্বনে বানানো নাটক '[i]একটা ফোন করা যাবে প্লিজ?[/i]' দেখার সময়। (অবশ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য কমরেড ইউটিউব, তোমাকে লালসালাম।) :)

মার্কেজের মূল গল্পটা বহুবার পড়া। আমার খুবই 'অপ্রিয়' গল্প এটা। হুমায়ুন আজাদের উপন্যাসগুলোর কিছু কিছু লাইন আছে এমন, পড়ার সময় মনের ওপর খুব চাপ পড়ে, হাসফাঁস লাগে, দম বন্ধ করা একটা অনুভুতি কাজ করতে থাকে মনে। মার্কেজের, বিশেষ করে এই গল্পটা তেমনি। যতক্ষণ পড়তে থাকি চারপাশের সবকিছুর ওপর অবিশ্বাস চলে আসে। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় হত বিহবল হয়ে পড়তে হয়। গল্পটা এরকম- রাতের অন্ধকারে পথ ভুল করে বসে একটা মেয়ে। বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে যে বাসে চড়ে বসে, সেটা ছিলো আসলে একটা মানসিক হাসপাতালের বাস। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটি, সকালে যখন উঠে, দেখতে পায়, হাসপাতালে নেমেছে সে, ডাক্তার ও নার্স পরিবেষ্টিত, এবং সবাই ভাবছে, সে-ও একজন মানসিক রোগী। মেয়েটা কোনভাবেই বিশ্বাস করাতে পারে না যে সে রোগী নয়, বারবার শুধু সে তার স্বামীকে ফোন করতে চায়, শুধুই আকুতি করে, একটা ফোন করা যাবে প্লিজ?

মার্কেজের মূল গল্পটা শেষ হয় বুকের ভেতরটা একদম দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে। গল্পে আছে, মেয়েটা ওই হাসপাতালেই থেকে যায় চিরকাল, ওর স্বামী বহুদিন পরে ওকে খুঁজে পায় সেখানে। কিন্তু কে জানে কার উপর অভিমানে সে আর ফিরে আসতে চায় না, ওখানেই থেকে যায় বাকি জীবন।

অমিতাভ রেজা গল্পটাকে নাটক বানানোর সময় আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপট দেখিয়েছেন। মেয়েটির ভূমিকায় ছিল সম্ভবত তাঁরই স্ত্রী, জেনি। ডাক্তার ছিলেন ইরেশ যাকের। প্রত্যেকের অভিনয়ই অনবদ্য ছিলো। প্রথমবার নাটকটি দেখার সময় মার্কেজের গল্প পড়ার সময়কার চাপটা টের পাচ্ছিলাম বেশ। নাটকের শেষটুকু দেখতে চাইছিলাম না একদম, জানিই তো কী হবে, আবারও মন খারাপে ডুবে যাবো। কিন্তু দেখি, অমিতাভ রেজা কাহিনি বদলেছেন ওখানে, নাটকের মেয়েটি শেষমেষ খুঁজে পায় ওর প্রেমিককে, এবং নাটকের শেষ পরিণতি হয় মিলনাত্মক।



আমি রীতিমত খুশি হয়ে গেছিলাম এই বদলে, মনে মনেই অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছি তাঁকে, মুগ্ধ হয়েছি তাঁর এডাপশানের মুন্সীয়ানায়।
*

গতকাল দেখলাম তাঁর বানানো এবারের ঈদের নাটক, [i]এ সময়[/i]।
নাটকের মূল গল্পটি নেয়া হয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প 'মিলির হাতে স্টেনগান' থেকে। আশ্চর্য এ-ই যে, এ গল্পটিও আমার বহু বহুবার পড়া। আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পগুলোর একটি এটি। গল্প হিসেবে এটি অসম্ভব শক্তিশালী। কিছু কিছু গল্পের প্লট আছে, যেগুলো বেয়াড়া ঘোড়ার মতন, কেবলই তেড়ে ফুঁড়ে আসে, এগুলোকে লাগাম পড়ানো শক্ত কাজ। ইলিয়াস ছাড়া আর কেউ এই গল্পটি সামলাতে পারতেন কিনা, সে নিয়ে আমার ব্যাপক সন্দেহ।
তো, এই অসম্ভব প্রিয় গল্পের নাট্যরূপ দেখতে পাবো আরেকজন প্রিয় পরিচালকের হাতে, এই আশা নিয়েই নাটক দেখতে বসা।
নাটক খারাপ লাগেনি, নাটক হিসেবে এটি ভালই হয়েছে। কিন্তু গল্পটা জানা থাকায় খানিকটা হতাশ হয়েছি আমি।

গল্পটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ের। তরুণ যোদ্ধারা ফিরে এসে সবাই ঠিক পথে হাঁটেননি। কেউ কেউ বেছে নিয়েছিলেন অন্ধকার জগত, গল্পের মূলভাবটা সেরকমই। কিন্তু নাটকে, এটাকে একদম এই সময়ের গল্প বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নাটকের অন্যতম মূল চরিত্র আব্বাস পাগলা। এই চরিত্রটি অবিকল ছিল অবশ্য, এবং বলা চলে গল্প আর নাটকের একমাত্র যোগসূত্রও ছিলো আব্বাস পাগলাই। গল্পে অন্ধাকার জগতের ব্যাপারটা ছিলো আবছায়ার মত, তার ফলাফল অবশ্য ছিল সামনেই। নাটকের প্রয়োজনেই হয়তো আবছায়াগুলোকে শরীর দেয়া হয়েছে, নতুন চরিত্র আনা হয়েছে অনেক, স্পষ্ট হয়েছে মিলির ভাই রানার কর্মকান্ড।

আমার অবশ্য মনে হয়েছে, এটার দরকার ছিলো না। এইটুকু স্পষ্টতা না দেখালেও চলতো। মূল গল্পকে অনুসরণ করে নাটকটা নির্মিত হলে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত সেটা।

মিলির হাতে স্টেনগান গল্পের আসল অংশ হচ্ছে এর শেষটুকু। যেখানে দেখায়, আব্বাস পাগলা ভাল হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু তাঁর কষ্টটুকু পাগলামি হয়ে ঢুকে পড়ে মিলির মাথায়, সে তখন ছাদের উপরে উঠে গিয়ে আকাশে উড়াল দেবার জন্যে পা ঝাপটায়।

আমার তীব্র আগ্রহ হচ্ছিলো, এটাকে চিত্রায়ন করা হয় কীভাবে তা দেখার। নাটকে ইলিয়াসের লেখার এই অনুভুতি নিয়ে আসা সহজ নয়। তো, [i]এ সময়[/i] নাটকটির শেষটুকু দেখেও আবারও খানিকটা হতাশই হতে হলো। ওরকম আবেদন আসেনি। নাটকটা হয়ে গেছে বিপথগামী কোন যুবকের বোনের গল্প, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের টানাপোড়া সেখানে অনুপস্থিত।

আগের বার খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু এইবার, এই বদলে মন খারাপ হলো।
জানি সম্ভব নয়, তবু যদি পারতাম, আমি অমিতাভ রেজাকেই অনুরোধ করতাম নাটকটা আরেকবার বানাতে, আর কাউকে নয়।

পুনর্জন্ম বিষয়ক একটি ব্যর্থ রচনা-

ভূমিকাঃ
-------
আমি টিভি খুব একটা দেখি না। একটা লম্বা সময় হোস্টেলে থেকেছি বলে টিভি-র প্রতি আকর্ষণ একদমই উবে গেছে। সিরিজ ধরনের নাটক বা ডকুগুলোর প্রতি আবার বিশেষ এলার্জি আছে, টিভিতে ওগুলো দেখাই হয় না তেমন।
এখানে এসে অবশ্য একটা উপকার হয়েছে, দোকানে গেলে বাংলাদেশী সিরিয়ালগুলো এক ডিভিতে সব দিয়ে দেয়, বিজ্ঞাপনের কোন ঝঞ্জাট নেই, মাঝখানে খবর দেখার টানাটানি নেই, একেবারে এক বসায় দশ পর্ব এক সাথে দেখে ঢেঁকুর তোলা যায়। কিন্তু এখানকার চ্যানেল বা তাতে প্রচারিত অনুষ্ঠান বিষয়ে আমি একেবারেই ওয়াকিবহাল নই। বাঙালীদের কোন আড্ডায় গেলে কেউ যখন চলমান কোন বিজ্ঞাপন বা সিরিয়াল নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, আমি তখন ভ্যাবলার মত চেয়ে থাকি।

এই আমারও অবশ্য মাঝে মাঝে টিভি দেখা হয়। এবং কিম আশ্চর্যম, সেটা হয় অন্য কারও বাসায় বেড়াতে গেলে। হতে পারে আমার অমিশুক স্বভাব এর জন্যে দায়ী, অথবা নতুন কারও সাথে হুট করে আলাপ জমাতে পারি না বলে হয়তো গভীর মনোযোগে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু বাসায় ফিরলেই আবার যে-কে সেই। আমার ঘরের টিভি মাসে একবারও জেগে ওঠে না।

বর্ণনাঃ
----------
সেদিন এমনই করে এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে টিভি দেখছিলাম। এনিমেল রেসকিউ ধরণের একটা প্রোগ্রাম। এখানে একটা সংস্থার মত আছে, এরা বিপদে পড়া পশু পাখিকে উদ্ধার করতে দৌড়ায়। ব্যাপারটা লাইভ সম্প্রচার নয় অবশ্য, তবে ঐ উদ্ধারকারী দলের সাথে সবসময়েই টিভি ক্যামেরা থাকে। উদ্ধারের পুরো সময়টাকে তারা ক্যামেরায় বন্দী করে নেয়, পরবর্তীতে টিভিতে সম্প্রচার করে।
টিভিতে উপস্থাপনের স্টাইলটা বেশ আকর্ষণীয়। এক সাথে তিনটা ঘটনা দেখাতে থাকে পরপর। আমি যেদিন দেখছিলাম, সেদিন দেখাচ্ছিলো, একটা বাড়ির সীমানার দেয়াল এবং ঘরের দেয়ালের মাঝখানে ৫ সেন্টিমিটারের মতন একটা ফাঁক, সে জায়গাটায় একটা বিড়াল আটকে গেছে, আর বেরুতে পারছে না।
অন্যদিকে দেখালো, একটা ক্যাঙারু, বেশ ক্ষ্যাপাটে বোঝাই যাচ্ছিলো, সেটা ঢুকে গেছে জাল দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে, ওখানেই আটকে আছে সেটা।
আর সমান্তরালে অন্য যেটা দেখাচ্ছিলো, একটা বাড়ি থেকে পঁচা গন্ধ পেয়ে এনিমেল রেস্কিউ টিমকে ফোন করে প্রতিবেশিরা, গিয়ে দেখা যায় বাড়ির বাসিন্দারা কেউ নেই, ভেতরে দুটো কুকুরের একটা মরে পড়ে আছে, অন্যটা মৃতপ্রায়।

তিনটে ঘটনার শুরুটা দেখায় পরপর, শ্বাসরুদ্ধ্বকর অবস্থা যাকে বলে। বিজ্ঞাপন বিরতির পরে আবার শুরু হয় অনুষ্ঠান, দেখায়, বিড়ালটাকে উদ্ধারের জন্যে রেসকিউ টিমের সাথে যোগ দিয়েছে দমকল বাহিনী। ওরা এসে বাড়ির দেয়াল ভাঙ্গার আয়োজন করা শুরু করে। সৌভাগ্যবশত, দেয়ালে হাতুড়ি ঠোকার শব্দে ভয় পেয়ে বিড়ালটা নিজেই টেনে হিঁচড়ে কেমন করে যেন বেরিয়ে আসে। টিভি পর্দার উদ্ধারকর্মীদের সাথে সাথে আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।

অন্যদিকে ক্যাঙারুটাকে ধরবার জন্যে বেশ বেগ পেতে হয় সবাইকে। একটা চাদরে একদম অতর্কিতে আটকে ফেলা হয় তাকে, তারপরে ছেড়ে দায় হয় বনের ভেতর।
আর সর্বশেষ, কুকুরটাকে তুলে নিয়ে আসা হয় উদ্ধারকর্মীদের গাড়িতে করে, সোজা পশু হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তারদের হাতে সঁপে দেয়া হয় তাকে।

পুরো অনুষ্ঠানটাই মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখলাম। রেসকিউ টিমের তৎপরতা আসলেই সাধুবাদ দেয়ার যোগ্য। কোন পশু-পাখী বিপদে আছে, এরকম ফোন পাওয়া মাত্রই তারা ছুটে যায় সেখানে, তারপরে অসীম ধৈর্য্য ও যত্নের সাথে উদ্ধার প্রক্রিয়া চালায়।
------------------------------------------------------------------------
টিভি প্রোগ্রামের গল্প শুনছেন, মাঝে একটা বিজ্ঞাপন বিরতি থাকবে না তা কী হয়?
নিলাম একটা বিরতি, ফিরে আসছি তারপরেই, সঙ্গে থাকুন।
------------------------------------------------------------------------

ঈদ গেল, অথবা যায়নি এখনও, যাই যাই করছে। আমরা এখানে কুরবানী দেই না, কিন্তু পরিচিত অনেকেই দেয়। তাদের বন্ধু-তালিকায় আছি বলে, অথবা কে জানে, হয়ত আপনাতেই "গরীব-দুখী"দের তালিকায় পড়ে যাই বলে ঘরে প্যাকেট ভর্তি কুরবানীর গোশত চলে আসে।
ঈদের খাবার দাবার তৃপ্তি নিয়ে খাই পেট পুরে।
আজ খেয়ে দেয়ে, পত্রিকা খুলে বসলাম। গত কদিনের ব্যস্ততায় খবর পড়া হয়নি একদম। প্রথম আলো-র প্রথম পাতা খুলেই দেখি লঞ্চডুবির ছবি।


ইতিমধ্যে মারা গেছে ৭৬ জন। ৩৬ জনকে এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। সাড়ে তিনশ ধারণ ক্ষমতার লঞ্চে যাত্রী তুলেছিলো তিন হাজার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ভেতরের খবর পড়তে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেলো আরো। লঞ্চে পানি ওঠা শুরু করেছিলো শুরু থেকেই, লঞ্চ কর্তৃপক্ষ পাত্তা দেয়নি। খানিক পরে যাত্রীরা টের পেয়ে নেমে যেতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ আটকে দেয়, অনেকেরই টিকেট কাটা হয়নি সে জন্যে। টিকেট না কেটে কোন ফাঁকিবাজ যাত্রী যেন না নামতে পারে, "বুদ্ধিমান" চালক তাই লঞ্চকে নিয়ে যায় মাঝ নদীতে। ওখানে [i]বিশৃংখল[/i] যাত্রীদের মধ্যে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে আনসার বাহিনি তাদের মারধর করে লঞ্চের পেছন দিকে নিয়ে যায়, সবাই একপাশে চলে আসায় তাল সামলাতে না পেরে লঞ্চ ডুবে যায়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছে, সরকারী ডুবুরিরা ডুব দিয়ে দিয়ে "[i]কী যেন খুঁজে[/i]", কিন্তু কোন লাশ পায় না। নিহতদের আত্মীয় স্বজনেরা তাই নিজেরাই নেমে পড়ে পানিতে লাশের খোঁজে।
উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ঠিক ৩৭ ঘন্টা পরে, যদিও আগের দিন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এসে বলে গিয়েছিলেন, এক ঘন্টার মধ্যেই জাহাজ এসে উদ্ধারকাজ শুরু করবে।

উপসংহারঃ
-------------

পরজন্মে পৃথিবীতে নামবার আগেই যদি সুযোগ পাওয়া যায়, বঙ্গদেশের মানুষ হয়ে জন্মাবার বদলে এই দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর-তীরবর্তী দেশের ক্যাঙারু বা নিদেনপক্ষে একটা বিড়াল হয়ে জন্মানো যায় কি না, এই বিষয়ে ঈশ্বরের কাছে তদবীর করার উপায় জানা আছে কারো?

Friday, November 27, 2009

কবি

যখন বয়েস কম ছিলো, অনেক সাহসী ছিলাম তখন। একেকটা ছোট ছোট রুলটানা কাগজের ডায়েরি, সেগুলোতে গোল গোল হরফে নানা রকম হাবিজাবি লিখে রাখতাম। কেউ জিজ্ঞেস করলে যে “কী এগুলো?”, নেপোলিয়ান অথবা আলেকজান্ডারের চেয়েও বেশি অহমিকা নিয়ে উত্তর দিতাম, “এগুলো কবিতা। কবিতা লিখেছি। ”

তারপর অনেকদিন গেলো। দিন যেতে যেতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বাজে যে ব্যাপারটা ঘটল তা হলো যে, আমি বড় হয়ে গেলাম।

কেন যে বড় হলাম, এই নিয়ে আমার দুখের সীমা নাই। এখন আর ডায়েরিতে হিজিবিজি লিখতে পারি না, লেখা আসেই না একদম। অনেকদিন পরে পরে হয়তো আসে দুয়েকটা লাইন, ভীষণ আনন্দ নিয়ে সেগুলোকে লিখে ফেলি খাতায়, কিন্তু তারপরে যখন পড়তে যাই, বুঝে যাই যে আমার সাহস কমে গেছে, আগের মতন দুর্মর বা দুর্বার ভঙ্গিতে এখন মোটেও সেগুলোকে কবিতা দাবি করতে পারি না। মনে ভয় হয়।
অথচ কবি হবার লোভ আমার অনেকদিনের। এই লোভের বয়েস, যদি দিন মাস গুনতে বসি, তাহলে ঠিক আমার বয়েসেরই সমান। কিন্তু কবি হতে পারিনি আমি, অথবা কবি হওয়া হয়ে ওঠেনি আমার।

ক্লাস সেভেনের দিকে নির্মলেন্দুতে জমেছিলাম খুব। এই দীর্ঘকায় কবির কবিতাগুলো কেমন করে যেন আমাকে জাদুটোনা করে ফেলেছিলো। শহরে থাকি বলে চাঁদ দেখতে পাইনা তখন, কলেজে বিদ্যুত গেলে বিশ্রি শব্দে জেগে উঠত জেনারেটর, তবু, নির্মলেন্দুর কবিতাগুলোই তখন আমার কাছে চাঁদমাখা স্বপ্ন হয়ে আসতো, আমাকে চন্দ্রাহত করে রাখতো সেগুলোই।

কবিতা আসলে আফিমের মতই, এমনি বাজে একটা নেশা, নেশা জেনেও যাকে ছেড়ে যাবার কোন উপায় নাই।
কবিতার রাস্তাটাও অনেক বর্ণিল, সেখানে পথ হারাবার ভয় নেই, সেখানে আঁধার নামলে পরে শক্তি, সুনীল, জীবনানন্দরা আবুল হাসানের সাথে মিলে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে আলো জ্বেলে দেন।
তো এরকম ল্যাম্পপোস্ট হবার লোভেও আমি কবি হতে চেয়েছিলাম।

কদিন আগে নতুন একটা মুভি দেখা হলো, ঋতুপর্ণ ঘোষের, সব চরিত্র কাল্পনিক। মুভিটা একজন কবিকে নিয়ে, একজন কবি, যার প্রয়াণের পরে শোকসভা থেকে সিনেমার শুরু। সেখানে মৃত কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে তার ইঞ্জিনিয়ার সহকর্মীরা, তার কবিতা পাঠকেরা, আবৃত্তিকারেরা, এবং তার স্ত্রী। মুভি দেখতে দেখতেই ভাবছিলাম, একটা সত্যিকারের কবির চরিত্রই আসলে এসেছে সেখানে, খানিকটা বোহেমিয়ান, যে তার ঘরের কাজের লোককে নিয়ে লিখে ফেলে দীর্ঘ কবিতা, অথচ সে লোক রাতে না খেয়ে আছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করতে ভুলে যায়। অথবা স্ত্রীর অসুখের সময়ে উদাসীন কবি, অথচ স্ত্রীর লেখা একটা কবিতার ছেঁড়া কাগজ খুজে নিতে যে গভীর রাতে বনে বাঁদাড়ে দৌড়ায়।

এরকম একটা কবি, সিনেমায় দেখালো, তার মৃত্যুতেও কত মানুষ কাঁদলো, কত মানুষে তাকে ভালবাসলো!

সিনেমা শেষ করে অনেকদিন পরে কিছু লাইন লিখে ফেললাম ঝটপট, তারপরে, গুটি গুটি পায়ে বুকশেলফ থেকে ডেকে নিয়ে আসলাম আবুল হাসানকে, বালিশের এক পাশে তাঁকে বসিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, বুঝলেন গুরু, আমারও কবি হতে ইচ্ছে করে খুব।

বিকেলবেলায়...

কবেকার কোন বৈশাখী মেলা থেকে একটা লাল
ডুরে শাড়ি কিনে এনে দিইনি বলে সে
আমার থেকে দূরে সরে সরে থাকে শুধু।
ব্যস্ত দুপুরের কোন একদিন একটা কাঠি
লজেন্স অথবা হাওয়াই মিঠাই এর আবদার আমার
মন ভুলে গিয়েছিলো হয়ত, সেই
থেকে, অভিমানী মেয়ে গাল ফুলিয়ে কেবলই
ছলছল চোখে চেয়ে দেখে আমাকে, কাছে আসে না।
বিকেলের ভেজা আলোয় আজ মনে পড়লে এক হাতে রঙিন
ফিতে আর অন্য হাতে কিছু ঝিলিমিলি চুড়ি নিয়ে আনাচে
কানাচে কেবলই খুঁজে বেড়াই তাকে।
দেয়ালে বসা টিকটিকি যেন শুনে না ফেলে অথবা আমার
জানলায় উঁকি দেয়া কাঠবিড়ালিকে লুকিয়ে আমি
ফিসফিস করে ডাকি, কবিতা, কোথায় রে তুই?
আর একটিবার আমার কাছে আয় সোনা মেয়ে।


মরে যাবার আগে একটা দিন আমি কবি হয়ে বাঁচি।
-------------
২১/১১/০৯

Tuesday, October 27, 2009

কবি বলেছেন -

কবি বলেছেন, জ্ঞানের কোন শর্টকাট নাই।
কিন্তু আমরা বুদ্ধিমান মানুষ, বোকা কবির কথায় ভুলবো কেন? আমরা তাই জ্ঞানার্জনের জন্যে অসংখ্য শর্টকাট খুঁজে বের করে ফেলি। উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি বানাই, পাঞ্জেরী হই, ফোকাস করে করে পড়ি।
ছোটবেলায় কোন এক গল্পে পড়েছিলাম, বালিশের নিচে ভূগোল বই রেখে ঘুমিয়েছে এক ছেলে, রাতের বেলা স্বপ্নের ভেতর তাই সে সারা দুনিয়ার ভূগোল দেখে ফেলেছে।

এই গল্প পড়ে ব্যাপক উৎসাহিত হয়েছিলাম। পরীক্ষার আগের রাতে বালিশের নিচে বই নিয়ে ঘুমানোটা প্রায় অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছিলো। স্বপ্ন-মামার যেন কোন স্বপ্ন দেখাবে এসব ভেবে কষ্ট না হয়, এ জন্যে যে চ্যাপ্টার পড়া হয়নি, ঠিক ঐ চ্যাপ্টারটাই খুলে রেখে ঘুমাতাম। অবশ্য দুঃখের বিষয়, তেমন কাজে আসেনি এই বুদ্ধি।

আরেকটু বড় হয়ে যখন প্রোফেসর শঙ্কুর সাথে দেখা হলো, খুবই মজা পেলাম। দেখি এই ভদ্রলোক নানান রকম বটিকা নিয়ে ঘোরাফেরা করেন। মৎস্যবটিকা নামের এক জিনিস খাওয়ান তার বিড়ালকে, বিড়াল নাকি আসল মাছের সাথে তার তফাৎ করতে পারে না। নিজের জন্যে আছে ক্ষুধানিবারণ বটিকা। এটাও জব্বর জিনিস, একবার খেলে দুতিনদিন আর খাওয়া লাগে না।

আমি ভাবলাম, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হওয়া ভীষণ দরকার। অনুরোধ করে একটা লেখাপড়া বটিকা বানিয়ে নিবো, খেলেই যেন লেখাপড়া সব পেটে ঢুকে বসে থাকে। এটা বানাতে বেশি কষ্ট হলে আলাদা আলাদা করেই না হয় বানাতে বলবো- বাংলা বটিকা, কেমিস্ট্রি বটিকা, ফিজিক্স বটিকা।

বড় হতে হতে বুঝে গেলাম, বটিকায় কাজ হবে না আসলে। জ্ঞানের আসলেই কোন শর্টকাট নেই।

সম্প্রতি ইউটিউব ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে হলো, নাহ, একটা শর্টকাট হয়তো সত্যিই এখনো আছে, লোকেদের অগোচরে যদিও!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ফরম নিয়ে কিছু দুই নম্বুরি করেছে কয়েকটা কোচিং সেন্টার। সেখান থেকে ফরম কিনেছিলো প্রায় কুড়ি হাজার শিক্ষার্থী, তারা কেউই নাকি এডমিট কার্ড পায়নি, পরীক্ষায় বসাও অনিশ্চিত। ভুক্তভোগী সেসব শিক্ষার্থীরা ফার্মগেটে মিছিল করেছে, নিজেদের দাবী জানিয়েছে। আমাদের সর্ব-কর্ম-পটীয়সী পুলিশ যথারীতি সেখানে গিয়ে লাঠি চার্জ করে বসেছে। বিশৃঙ্খলা তাদের সহ্য হয় না কি না!

ইউটিউবের একটা ভিডিওতে এটিএন বাংলার সংবাদের একটা ছোট্ট অংশ দেখলাম। সেখানে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এসেছে কিছু, দেখছিলাম, তারপরে দেখি পুলিশদেরও দেখাচ্ছে, তাও দেখছিলাম, এবং সবশেষে দেখলাম, এই ছাত্রদের লাঠিপেটা করা ছাড়াও সাথে ফাও হিসেবে জনৈক পুলিশ অফিসার জ্ঞান অর্জনের সহজ উপায়ও তাদের বাতলে দিচ্ছেন। তিনি সুন্দর ভাবে ক্যামেরার সামনেই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, লেখাপড়া পুটকির মধ্যে ভইরা দিবো একদম!



আমি বিস্মিত, হতবাক। এই সাংঘাতিক শর্টকাট দুনিয়ায় আর কারও মাথায় কেন আসলো না?
তাইতো রে ভাই, দিন নেই রাত নেই বই খুলে বসে বসে পড়ালেখা শেখা, তারচেয়ে এটা কতই না কাজের। আমি বারবার রিওয়াইন্ড করে সেই পুলিশ অফিসারের মুখমন্ডল দেখলাম। ইস, বুঝতে পারছি যে এভাবে পেছন দিয়ে লেখাপড়া ভরে ভরে, ইয়ে, আই মিন, করে করে ভদ্রলোকের খুব কষ্ট হয়েছে এতদিন। কিন্তু দেখুন, সেটা কত কাজে এলো! লাঠি সোটা হাতে একেবারে পুলিশ বনে গিয়েছেন। বুঝুন তাহলে!

একটু দুঃখও হলো। এবারের নোবেল ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে বেকুবগুলা, তা না হলে এই পুলিশ ভদ্রলোকের নাম সেই কমিটিতে পাঠিয়ে দেয়া যেতো। ইদানিং কত কিছু করে লোকে নোবেল পায়, ওবামার মত ভাগ্যবান হলে কিছু না করেও পায়। আর, আমাদের পুলিশ অফিসার, এরম চমৎকার একটা আবিষ্কারের যথাযোগ্য মূল্য পাবে না?
তা হয় না।
কবি বলেছেন, নামে নয়, কর্মেই পরিচয়। তাই উক্ত পুলিশ অফিসারকে তার কর্মের উপযুক্ত পুরস্কারে ভূষিত করার দাবি জানাই।

পরিশিষ্টঃ
---------
১।পুলিশের কথাটা একটুও সেন্সর না করেই লিখে দিলাম। ইচ্ছে করেই। আমি দুঃখিত যে, এরকম অশালীন কাজ করেছি বলে আমি একটুও দুঃখিত নই।
২। এটিএন বাংলার সেই সাংবাদিককে ধন্যবাদ, সংবাদ সম্পাদনার টেবলে বসেন যারা, তাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ এ অংশটুকু না কেটে এটা টিভিতে সম্প্রচার করেছেন বলে। এই নিউজটা সবার দেখার দরকার ছিলো।

Tuesday, September 01, 2009

এইসব সাদা কালো ফ্রেম-

আমার বাকশে থাকতো এতটুকু ছানা মিষ্টি,
আমার চোখের কোণে তোর আটকে থাকা মুখ
আমি বলতাম, বৃষ্টি!

ডাক শুনে হুঁ বলে তুই তাকাতি আমার দিকে,
তোর নীলচে সবুজ স্কার্টে বাদামী ধুলো-
তোর সাদা শার্ট আর সাদাটে ফুল চারদিকে

তোকে ডাকলাম কই, আমি বলতাম, বৃষ্টি নামবে দেখ।
তোর অবাক ভুরু- আচ্ছা পাজি তো-
তোর চোখে টলটলে মেঘ।

আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই, তোদের পাশের বাড়ি,
আমাদের পাশাপাশি ইশকুল, আমাদের রোদ্দুর কাড়াকাড়ি।

আমার তোবড়ানো স্যান্ডউইচ-
তোর বাকশের আলু পরোটা দিলে
আমরা পাশাপাশি বসে, কতগুলো দুপুর উড়ে উড়ে চলে।

আমার বাকশের গোল টিফিনের সাথে,
মাঝে মাঝে থাকতো আমার মন
তুই জানতি, ঠিকই টের পেতিস
তুই আঙুল ছুঁয়ে বসে থাকতি যখন।

সেই অনেক দূর থেকে ভেসে আসা এইসব সাদা কালো ফ্রেম
আমরা দূরান্তে বয়ে যাই, মনে পড়ে আমাদের টিফিন বেলার প্রেম।
-----------------------
২৭/০৮/০৯

Friday, August 28, 2009

অনুবাদ প্রসঙ্গেঃ এইবার তবে উলটো পথে চলো-

এখানকার একটা নামকরা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা পড়তে গিয়ে সম্ভবত প্রথম মাথায় আসে কথাটা। অথবা তারও আগে, হয়ত ঝুম্পা লাহিড়ি পড়ছিলাম যখন, তখন। অথবা, এখন মনে হচ্ছে আরও খানিক আগে, মার্কেজের গল্পগুলো যখন পড়ছিলাম, সম্ভবত তখনই।

সাহিত্যপাতায় যে গল্পটা পড়ছিলাম, সেটা আবার সে পত্রিকার সাহিত্য আয়োজনে প্রথম পুরষ্কারপ্রাপ্ত। গল্পের শুরুতে আলাদা রঙ ও ফন্টে সে কথা বিশেষভাবে জানান দেয়া, গল্পের মাঝামাঝি আলাদা একটা বাক্সে লেখকের নাতিদীর্ঘ পরিচিতি, এবং গল্পের সাথে মানানসই চমৎকার একটা ছবি। বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, একজন লেখকের গল্প। ল্যাপটপে গল্প লিখতে গিয়ে তার কাছে গার্লফ্রেন্ডের ফোন আসে, গল্প না গার্লফ্রেন্ড এই দ্বিধায় কেটে যায় গল্পের বাকি অংশটুকু, সবশেষের লাইনে, দেখা যায় ল্যাপটপ খুলে রেখে লেখক বসে, মোবাইলটা সুইচ্ড অফ।
গল্পটা খারাপ লাগে না, পড়ে নিয়ে ভাবি, গল্পটা মন্দ নয়; কিন্তু তারপরেই ভাবি, গল্পটা আসলে কতটুকু ভাল?

ঝুম্পা লাহিড়ি পড়তে গিয়ে এমন হয়েছিলো। খুব ভাল লেগেছিলো ইন্টারপ্রেটার অব মেলাডিস, এই সহজ সরল বর্ণনা, বিষয় বাছাইয়ের সারল্য, সবই। কিন্তু মাথায় ঘুরছিলো ওয়ালীউল্লাহ বা হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোর ধার। তুলনা টানার প্রশ্নই আসে না, আমি ভাবছিলাম অন্য কিছু। ভাবছিলাম, শুধু ইংরেজিতে লেখা বলেই এই গল্পের লেখকেরা বিনা আয়াসেই কেমন করে পৌঁছে গেলেন আমার মতন একজন ভিনভাষীর কাছে।

কদিন আগে কোয়েটজি-র ডিসগ্রেস পড়ছিলাম, এখনো শেষ করিনি, কিন্তু পড়ার সময় খুব ভাল লাগছিলো, বর্ণনাগুলো কি টানটান, হুট করে গল্পের এমাথা ওমাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে চিরে দেয়া কিছু দৃশ্যপট। আমার মনে হচ্ছিলো, আমাদের ইলিয়াসের গল্পের যে চমৎকারিত্ব, সেও কি কিছু কম?
আমার খানিকটা দুঃখবোধ হলো তখন। আমাদের ইলিয়াস, মানিক, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল, এঁরা কেবল আমাদেরই রয়ে গেলেন, যাবেন, পুরো বিশ্বের পাঠকদের কাছে তাঁদের পৌছানো হবে না কোনদিন। কারণ, এনাদের সাহিত্যকর্ম কেবল বাংলায়ই পাওয়া যায়, ইংরেজি বা আর কোন ভাষায় নয়। অথচ যদি এঁদের লেখা পড়তে পেতো পুরো দুনিয়া,তবে বুঝতো, আমাদের এই সোঁদাগন্ধের বাংলা মাটিতে কতই না রত্ন ছড়িয়ে আছে!

মাইকেল মধুসুদন গোত্রীয় কোন ভাবনা আমার মাথায় চেপে বসেছে ভাবার কোন কারণ নাই। আমি বলছি না, আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে লেখার দরকার ছিলো।
কদিন আগে সৈয়দ হক এর একটা লেখায় এরকম কিছু পড়েছিলাম, ফজলে লোহানী কোন এক আলাপচারিতায় তাঁকে বলেছিলেন ইংরেজিতে লিখতে। কারণ, ইংরেজির মাধ্যমেই পুরো পৃথিবির কাছে পৌঁছানো যায়। সৈয়দ হক, স্বভাবতই এ কথা কানে নেননি। আমারও সেই একই কথা। আমাদের লেখকদের ইংরেজিতে কেন লিখতে হবে? কেন তাঁদের লেখাগুলোকেই আমরা দায়িত্ব নিয়ে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিবো না?

অনুবাদ সাহিত্য আমাদের ভাষায় এখন পোক্ত আসন করে নিয়েছে। বিশ্বের নানান ভাষার ক্লাসিক বা শ্রেষ্ঠতম গল্প-উপন্যাসগুলো আমরা অনুবাদের কল্যাণে চট করে বাংলায় পড়ে ফেলতে পারছি। এ কারণে, আমি ব্যক্তিগতভাবে, আমাদের অনুবাদকদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি ভাবছি, অনুবাদের ক্ষেত্রে এবার বোধহয় আমাদের উলটো পথে হাঁটবার সময় হয়ে এসেছে। বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদই শুধু নয়, এখন থেকে আমাদের বাংলা সাহিত্যর ইংরেজি অনুবাদ প্রকল্প নিয়েও ভাবা উচিৎ।

মার্কেজ পড়া শুরু করার পরে এই ভাবনাটা একটা পাকাপাকি আসন পেল মাথায়। আমি দেখলাম, মার্কেজ কি দারুণ ভাগ্যবান। উনি নিজের ভাষায়ই লিখেন, কিন্তু লিখবা মাত্রই সেসব অনুবাদ হয়ে চলে আসে আমাদের কাছে। রাশানরা একসময় পৃথিবি জুড়ে এই অনুবাদ প্রকল্প ছড়িয়ে দিয়েছিলো, তাদের গল্প-উপন্যাস, রূপকথা, সবকিছুর নানান ভাষার অনুবাদ পাওয়া যেত সবখানে। তাহলে আমরা পারবো না কেন? এরকম উদ্যোগ সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নেয়া কি একেবারেই অসম্ভব?

আমি এখনো জানি না, বুঝতে পারি, অনেক বড় একটা প্রকল্প হয়তো এটা, হয়ত অনেক অর্থের প্রয়োজন। তবু আমার স্বপ্ন, কখনো যদি সুযোগ পাই, আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠ কাজগুলিকে অন্ততপক্ষে ইংরেজিতে অনুবাদ করার একটা উদ্যোগ অবশ্যই নেব।
আমার এরকম স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে, কাম্যুর যে আগন্তকের দুঃখে এই সুদূরে বসে আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, অথবা মার্কেজের যে কর্নেলের পাশে বসে একটা কখনো-না-আসা চিঠির অপেক্ষা করি, তেমনি করেই হয়ত কোন একদিন সেই জর্মন বা স্পেনের কোন এক জানালায় বসা কোন এক কিশোর ইলিয়াসের হাড্ডি খিজিরের সাথে ঘুরে বেড়াবে ঢাকার গলি-ঘুপচি, অথবা মাহমুদুল হকের আব্দুল খালেকের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে রেখাকে ডেকে বলবে, গিরিবালা, ও গিরিবালা, তোমার এত রাগ কেন গো গিরিবালা?

ছোটবেলায় রচনা বইয়ে পড়েছিলাম, যদি এক কোটি টাকা পাইতাম, তবে সকল গুড় ভাত দিয়া খাইতাম।
আমি আজ ভাবি, এক কোটি টাকা সত্যিই যদি পাইতাম, তবে বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করে দুনিয়াময় ছড়িয়ে দিতাম।

Thursday, August 20, 2009

প্রকাশায়তন নিয়ে টুকটাক ভাবনা-

১।
বিদেশী বইগুলো সরাসরি ইংরেজিতে পড়া শুরু করি মূলত দেশের বাইরে এসে। তবে খুব আনন্দ নিয়ে নয়, বাংলা বইয়ের যোগান ছিলো না পর্যাপ্ত, এদিকে বই না পড়লে মাথায় তালগোল লেগে যায়, তখুনি স্থানীয় গণপাঠাগারে গিয়ে বই আনা শুরু করি। সেবা প্র‌কাশ‌নীর অনুবাদের পর সেই প্রথম বিদেশী সাহিত্যের সাথে ভালমতন মোলাকাৎ হলো, লেখকের নাম ধরে ধরে বই শেষ করার পুরনো অভ্যাসটা আবার ভাল মতন জাগিয়ে তুললাম।

সাহিত্যের প্রসঙ্গ অবশ্য আজ তুলবো না। সম্প্রতি প্রকাশায়তনের আত্মপ্রকাশ সম্পর্কিত ঘোষণার পর থেকে মাথায় একটা জিনিস ঘুরছে, তাই নিয়ে আলাপ জুড়বো বলেই আজ লিখতে বসা।
এখানে এসে পড়া বইগুলো হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখি, প্রায় অনেকগুলো উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের লেখক ছাড়াও সম্পাদক ( এডিটর এর বাংলা এ ক্ষেত্রে কী হবে?) বলে একজন আছেন সেখানে।
পত্র-পত্রিকার বাইরে বইয়ের সম্পাদ্ক হিসেবে কাউকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই আসলে। বইয়ের সম্পাদক যিনি, সেটাও ক্ষেত্র বিশেষে, যেখানে আসলে তিনি সংকলক। হয়ত লোকান্তরিত কোন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে একটা সমগ্র বেরুবে, সেখানে লেখাগুলো একসাথে জড়ো করে একটা জবরদস্ত ভুমিকা লিখে দেয়া আমাদের সংকলকের দায়িত্ব।
আমি একটু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বিদেশি বইগুলোয় ঠিক এরকমটা হচ্ছে না। এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বা গল্প সংকলনের বই, লেখকের জীবিতাবস্থায়ই একজন সম্পাদকের নাম সহ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার আগ্রহ জন্মালো, এই সম্পাদকের ভূমিকাটা আসলে কী?

২।
লেখালেখি সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা টিক্ষা না থাকায় হুট করে বুঝে নিতে একটু সময় লাগলো। শেষমেষ লাইব্রেরি ঘেঁটে ধরে বেঁধে নিয়ে আসলাম বেশ কিছু ক্রিয়েটিভ রাইটিং সংক্রান্ত বই। পড়ে টড়ে টের পেলাম যে এসব দেশে সম্পাদকের বেশ কদর আছে। একজন লেখক একটা বই লিখে হুট করে ছাপিয়ে হয়ত ফেলতেই পারেন, কিন্তু এটা এখানকার, যাকে বলে সিস্টেমেটিক ওয়ে, সেটা না। সাধারণত যেটা হয়, লেখক সেটা প্রকাশকের দপ্তরে পাঠাবার আগে কিংবা পরে সেই পান্ডুলিপিটি একজন সম্পাদকের হাতে যাবে। সম্পাদক বাছাইয়ের কাজ লেখক বা প্রকাশক যে ইচ্ছা করতে পারেন। সম্পাদক তখন পান্ডুলিপিটি পড়ে তার মতামত জানাবেন লেখককে, এবং তারপরে লেখক ও সম্পাদকের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে লেখাটির চূড়ান্ত কপি।

এটা অবশ্য একেবারেই পুঁথিগত বিবরণ, আদতেই এরকম হয় কি না জানি না। তবে কয়েকদিন আগে সালমান রুশদির একটা লেখার অনুবাদ করছিলেন একজন সচল, সেখানেও দেখলাম সম্পাদকের উল্লেখ আছে। সম্ভবত মিডনাইট়স চিল্ডরেন বইটি প্রসঙ্গে সম্পাদকের ক্রিয়াকলাপের কথা বলেছিলেন তিনি।

৩।
আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশে এই ব্যাপারটার চর্চ্চা আছে কিনা। সম্ভবত, নেই।
সেটার কারণ অনেক হতে পারে। যেমন ধরা যাক লেখকদের স্বাধীনতাবোধ। অনেকেই নিজের লেখার উপরে এত বেশি আস্থা রাখেন যে আর কোন সম্পাদকের কলমের সামনে তাঁদের পান্ডুলিপিকে রাখতে রাজি হন না। বড় বড় লেখকদের কথা বাদই দিলাম, এই যে আমি একজন অলেখক, সেই আমিও ক্লাশ এইটে পড়বার সময় একটা দেয়ালপত্রিকার জন্যে জমা দেয়া গল্পে বাংলা ম্যাডামের কলম চলায় গল্প ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। এখন মনে পড়লেও হাসি পায়, কারণ, এটা অনুচিৎ হয়েছিলো, এখন বুঝতে পারি।

আরেকটা কারণ হতে পারে, খরচ।
পান্ডুলিপি থেকে বই হিসেবে বের হওয়া পর্যন্ত অনেক সময় লেগে যায়, অনেক খরচও পড়ে। এর মাঝখানে আবার একজন সম্পাদককে নিয়ে আসাটা সময় ও অর্থ দুইদিক হয়তো একটু ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

তবে বাংলাদেশে এরকম কিছু আসলেই প্রয়োজন আছে কিনা, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
গতকালই একটা বইয়ের কথা লিখেছি এখানে। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। এই বইটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিলো, যদি বই ছাপানোর আগে কাউকে দিয়ে পান্ডুলিপিটি একটু সম্পাদনা করা যেত, তাহলে বেশ হতো। সবমিলিয়ে এমনিতেই খুব চমৎকার একটি বই এটি, কিন্তু ভাষা বা শব্দ নিয়ে আরেকটু যত্ন করা গেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বইটি দ্বিধাহীন ভাবে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে দাঁড়াতো।

৪।
সচলায়তন থেকে প্রকাশনা বিষয়ে একটা চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, প্রকাশায়তন নাম দিয়ে। এ সংক্রান্ত সন্দেশের পোস্টটিতে সচলদের করা মন্তব্যগুলো পড়লেই বোঝা যায় ব্যাপারটি বেশ সাড়া ফেলেছে, অনেকের মনেই প্রকাশায়তন থেকে বই বের করার ইচ্ছে জন্মেছে।
প্রকাশায়তন বইয়ের জগতে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী অনেক উদাহরণ তৈরি করবে বলে আশা করছি, সেই সাথে ভাবছি, প্রকাশিতব্য সব বইগুলো সম্পাদক বা সম্পাদকমন্ডলীর সহায়তা বা পরামর্শ নিয়ে আরও নিখুঁত হিসেবে বের করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে কি? অবশ্যই সেটা হবে লেখকের সম্মতিক্রমে। এবং এখানে সম্পাদক কোনভাবেই কোন জোরজবরদস্তি খাটাবেন না, বরং পান্ডুলিপি পড়ে লেখক ও প্রকাশায়তনকে তার মতামত জানাবেন। অতপর সেই মতামতের আলোকে লেখক ও প্রকাশায়তন ঐকমত্যে পৌঁছালে পরে বই প্রকাশিত হবে।
মানসম্মত বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলে কেমন হবে আসলে? আমার ব্যক্তিগত ধারণা ব্যাপারটি খুবই ভালো হবে, হয়ত এর সুফল প্রতিফলিত হলে আস্তে ধীরে এটাই আমাদের প্রকাশনা জগতের একটা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার সন্তানকে অন্তত এই বইটি পড়তে দিন-

একদম পলকা একটা বই। বড় বড় হরফে ছাপা সবমিলিয়ে মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠা। তার নিজস্ব ওজনের সিংহভাগই হচ্ছে শক্ত বাঁধাইয়ের কল্যাণে। আমার খাবার টেবলের পাশে রাখা ওজন মাপার মেশিনটায় তুললে কাঁটা খুব একটা নড়ে চড়ে না, দেখেছি। কিন্তু পড়তে গিয়ে যতবারই বুকের ওপর রেখেছি, মনে হয়েছে, এর চেয়ে ওজনদার বা ভারী কিছু বোধহয় আর নেই!
বইয়ের নাম, একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। মেজর হামিদুল হোসেন তারেক বীর বিক্রমের লেখা বই। একাত্তর সালে লেখক নিজেও কমবয়েসী ছিলেন, হায়ার সেকেন্ডারীতে পড়তেন। তবু সেই সময়েই তিনি যুদ্ধে চলে যান; এবং দেশের নানা জায়গায় তিনি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন।
এই বইটি অবশ্য মেজর হামিদুল হোসেনের নিজের গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি বেশ কয়েকজন কিশোরের সংস্পর্শে আসেন যারা নানা ভাবে যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে সহযোগীতা করেছিলো। সেইসব কিশোরদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেই এই বই।

সাতটি আলাদা অনুচ্ছেদে সাতজন কিশোর কিশোরীর কথা আছে এখানে। রমজান আলী, শশীলাল চর্মকার, নুরু নাপিত, পুতুল, আজিজ মন্ডল, বারেক ও তোতা।
মেজর হামিদুল হোসেন নিয়মিত সাহিত্যিক নন। এই বইটির ভাষায় তাই তেমন কোন মাধুর্য্য নেই। একদম সোজা সাপ্টা লেখা। লেখকের বাংলাও খুব যে ভাল নয়, সেটাও স্পষ্ট হয় কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বা বাক্যের গঠন দেখলেই। কিন্তু, এটা এমনই একটা বই, ভাষার সৌন্দর্য্য যেখানে খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। এই বইয়ের ভাষার উৎপত্তি কলমের মাথা থেকে নয় বলেই বোধ হয়। এটার উৎপত্তি ভিন্ন কোন জায়গা থেকে, বুকের খুব গভীরের, প্রাণের কাছাকাছি কোন চোরাকুঠুরি থেকে।

শশীলাল চর্মকার বা নূর মোহাম্মদ নাপিত, যারা পরিবার হারিয়ে এখানে ওখানে ঠোকর খাচ্ছিলো, পরে লেখকের দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে এরা, নানা অভিযান সফল করে তুলতে বিস্তর ভূমিকা রাখে। পুতুল নামে এক কিশোরীর কথা আছে, যে পাকবাহিনীর গায়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো কজন মুক্তিযোদ্ধাকে। এরকম এক এক করে প্রত্যেকের অসীম সাহসিকতার কথা বলা এই বইয়ে।

রমজান আলী নামে এক কিশোরের কথা বলেছেন লেখক, রাজাকার সন্দেহে লেখকের দলের মুক্তিযোদ্ধারা যাকে ধরে এনেছিলো। পরে আসল ঘটনা জানা যায়। বিহারীরা ওর পুরো পরিবারকে মেরে ঘরদোর জালিয়ে দেয়। পরে যার আশ্রয়ে যায় রমজান, তার দোকানে এক রাজাকার কমান্ডারের আনা গোনা ছিলো, ওখান থেকেই রমজানকে নিয়ে যায় সে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসে পুর দস্তুর যোদ্ধা বনে যায় সে। শত্রুপক্ষের খবর নিয়ে আসে, সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেয়। এবং একটা অপারেশনে গিয়ে রমজান পাকসেনাদের পাতানো মাইনে পা দিয়ে ফেলে, তার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শহীদ হয় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রমজান।

বইয়ের প্রতিটি কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা পড়তে গিয়ে গলা বুজে আসে। কী ভাগ্য আমাদের যে শুধু কষ্ট করে আমাদের একটু জন্মাতে হয়েছে, সাথে সাথে বিনেপয়সায় একটা দেশ পেয়ে গেছি আমরা। অথচ এই দেশটাকে আনবার জন্যে কত কত মানুষের রক্ত অশ্রু আর ত্যাগ যে জড়িয়ে আছে, তার কিছুই আমরা জানি না!

এমাজন ডট কমে দেখলাম হ্যারি পটারের নতুন বইটার দাম বাংলাদেশী টাকায় সাড়ে নয়শো টাকা। আর একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটির মূল্য ঠিক তার ষোল ভাগের একভাগ, মাত্র ষাট টাকা।
উঁহু, যারা ভাবছেন হ্যারিকে পছন্দ করি না আমি, ভুল ভাবছেন। রূপকথার আমি আজীবন ভক্ত, হ্যারি ও তার বন্ধুরা আমার কম প্রিয় নয়। আজকের শিশুরা হ্যারি পটার পড়তে পড়তে বড় হোক, এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আমি শুধু চাইবো, হ্যারি পটারের সাথে সাথে আপনারা আপনাদের সন্তানের হাতে একটি করে একাত্তরের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বইটিও তুলে দিন।

রূপকথার জাদুকর কিশোরকে স্বপ্নের নায়ক ভেবে নিক নতুন প্রজন্ম, সমস্যা নেই, কিন্তু সেই সাথে জীবন যুদ্ধের যারা সত্যিকারের নায়ক, তাদের যেন জানতে পারে তারা, চিনতে পারে; তাতে যেন ভুল না হয় আমাদের।

Friday, August 07, 2009

সাপুড়ে লেখক, মাহমুদুল হক?

মাহমুদুল হকের "কালো বরফ" পড়তে পড়তে, সম্ভবত, বার তিনেক আমাকে পাতা উল্টে প্রথম প্রকাশের তারিখটা দেখে নিতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে বেরিয়েছিলো এই বই। ঠিক সতের বছর আগে। কিন্তু তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো, এটির রচনাকাল আরও পেছনে, অগাস্ট ১৯৭৭! তিরিশ কিংবা তারও বেশি বছর বাদে, আমার নিজের চেয়েও বেশি বয়েসী এই বইটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে ভাবছি, মাহমুদুল হক কেমন করে এত বছর আগেই এরকম একটা চির-আধুনিক উপন্যাস লিখে গেলেন!

চারপাশের পাওয়া বইগুলোকে চিরকালই আমি উঁইপোকার চেয়েও বেশি যত্নে আর আদরে গিলে নিয়েছি। লেখক বা বইয়ের সংখ্যা হিসেব করলে সেটা অ-নে-ক ল-ম-বা একটা লিস্টি হয়ে দাঁড়াবে কোন সন্দেহ নেই। এবং, কে জানে, মনের গভীরে কোথাও এই নিয়ে হয়তো কোন আত্মতৃপ্তিও কাজ করে আমার মধ্যে। কিন্তু সেটি যে আসলে অনেকটা বোকার স্বর্গের মতই ব্যাপার, এটা টের পেলাম সম্প্রতি "প্রতিদিন একটি রুমাল" আর "কালো বরফ" পড়ার পরে।

লেখায় জাদু-টাদুর কথা শুনেছি অনেক। কালো বরফের প্রতিটা পাতায় আমি মনে হলো সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। উত্তম পুরুষে লেখা একটানা উপন্যাস। আবার ঠিক একটানা নয়। একটা জীবনেরই দুটি সময়ের কথা পরপর অথবা পাশাপাশি বলে যাওয়া, অবলীলায়। এরকমটা অবশ্য অনেক দেখেছি। এই মুহুর্তেই মনে পড়ছে দূরবীন এর কথা, শীর্ষেন্দুর, আমার খুবই পছন্দের একটা লেখা। কিন্তু সেখানে একটা আয়োজন ছিল। একটা মানুষের জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলবার জন্যে যে বিপুল বিস্তারের দরকার, যতখানি আড়ম্বরের দাবীদার সেটা, শীর্ষেন্দু সেসবে একেবারেই অকৃপণ। কালো বরফে তার একদম উল্টো। কোন আয়োজন নেই, যেন, আমি বলে যাচ্ছি, তুমি শুনলে শুনো না শুনলে নেই, এরকম একটা ড্যাম কেয়ার ভাব।

একটু আগে বলেছিলাম উত্তম পুরুষে লেখা, আসলে পুরোপুরি তা নয়। শৈশবের অংশটুকু উত্তম পুরুষে, কিন্তু সাথে সাথেই বড় হয়ে যাবার অংশটুকু লেখকের বয়ানে বলা। কিন্তু কোথাও বেসুরো লাগেনি। বেসুরো, এই শব্দ ব্যবহারের কারণ, প্রতিটা চমৎকার গল্প বা উপন্যাসই আমার কাছে খুব যত্ন নিয়ে গাওয়া গানের মত মনে হয়। ঠিক সুরে, তালে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা চমৎকার সঙ্গীত। কালো বরফও তাই।

প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় নয়, রঙের বাহুল্য চোখে লাগে। আমাদের এখনকার বইগুলোর মত ব্যাক কাভারে ছবিসুদ্ধ লেখক পরিচিতি নেই। কিন্তু বাইরের সৌন্দর্যের পুরো ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে বইটার ভেতরকার সৌন্দর্যটুকু।

হক সাহেব শুনেছি ব্যক্তিজীবনে রত্ন বা পাথর নিয়ে কাজ করতেন। ওনার লেখা পড়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে, উনি গোপনে গোপনে সাপুড়ে ছিলেন না তো? তা নইলে এরম অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তির খোঁজ উনি কেমন করে পেলেন! লেখা পড়ে যাই, কিন্তু লেখা তো নয় যেন সাপের চোখে চোখ ফেলে বশ হয়ে গেছি!
তো পড়ে টড়ে, সবমিলিয়ে, নিজের প্রতি আমার গভীর অনুকম্পা হলো। এরকম দুর্দান্ত লেখা পড়তে আমার জীবনের সাতাশটা বছর খরচ করে ফেললাম, দুর!
আমায় দিয়ে আসলে কিসসু হবে না।